ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পেসক্রিপশন অনুযায়ী ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। কিন্তু আওয়ামী লীগের নিদের্শনা মেনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবারও বলির পাঠা হচ্ছেন এইচ এম এরশাদ। কারণ ১০ম সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনী ব্যয় নির্দিষ্ট সময়ে জমা না দেয়ার কারণে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড পেতে যাচ্ছেনতিনি।
ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব না দেয়ায় গত সপ্তাহে এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারকে নির্দেশনা দেয়া হয়। আর এর পেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং অফিসার মোঃ হাবিবুর রহমান মামলা করেন। এখন শুধু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার অপেক্ষা। আর এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে কারাদন্ড ও অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন এরশাদ।
নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, হিসাব না দেয়ার অপরাধে দুই থেকে সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও অর্থদন্ডে দন্ডিত হতে পারেন তিনি। পাশাপাশি আদালত কারাদন্ড দিলে সংসদ সদস্য পদও হারাতে পারেন সাবেক এ সেনা প্রধান ও স্বৈরশাসক।
গণপ্রতিনিধত্ব আদেশের (আরপিও) ৪৪-সি ধারায় আরও বলা হয়েছে, নির্বাচিত ব্যক্তিদের নাম গেজেটে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনী এজেন্টকে নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট এলাকার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হবে। এর পাশাপাশি ব্যয়ের অনুলিপি রেজিস্টার্ড ডাকযোগে নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে হবে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদেরও ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হবে। আরপিওর ৭৪ ধারা অনুযায়ী, এ বিধান লঙ্ঘনের শাস্তি দুই থেকে সাত বছরের জেল।
সূত্র আরও জানায়, দশম সংসদ নির্বাচনে এরশাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা নিয়ে নানা নাটকীয়তা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় ১০ম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিবেননা বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদ। এরপর এরশাদের নির্দেশে তিনিসহ দলের অনেক প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করেন। দলের অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্দেশে এরশাদের রংপুর-৩ (সদর) ও লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা) মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বহাল থাকে এ দুই আসনে এরশাদের প্রার্থিতা।
নির্বাচন শেষে রংপুর-৩ আসনের হিসাব জমা দিলেও লালমনিরহাট-১ আসনের হিসাব জমা দেননি এরশাদ। এ কারণে আইনের ফাঁদে ফেঁসে যাচ্ছেন তিনি। বিষয়টিকে এত দিন এরশাদ গুরুত্ব না দিলেও এখন তা বেশ জটিল আকার ধারন করেছে। আর আরপিও অনুযায়ী মামলা হওয়ায় তা আর প্রত্যাহারেরও কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করেন এরশাদ। গত বৃহস্পতিবার তিনি এক ইফতার পার্টিতে বলেন, জাতীয় পার্টি ছাড়া আওয়ামী লীগ কখনোই এককভাবে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই জাতীয় পার্টির ওপর ভর করে এসেছে।
অপর এক অনুষ্ঠানে তিনি ইসির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, নির্বাচন কমিশনের কারো মেরুদন্ড নেই। এমন নির্বাচন কমিশন আমরা চাই না।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং অফিসার মোঃ হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা) আসন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচনী রিটার্ন জমা দেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সময়সীমা অতিক্রমের ২ মাস ২০ দিন পরও ব্যয় বিবরণী জমা না দেয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, যথাসময়ে নির্বাচনী ব্যয় বিবরণী দাখিল না করায় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশেই মামলা হয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের উপসচিব মিহির সারওয়ার মোর্শেদ বলেন, গত ৮ জানুয়ারি নির্বাচিতদের গেজেট প্রকাশ করায় ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ব্যয় রিটার্ন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেয়ার কথা। একই সঙ্গে এফিডেভিটের অনুলিপি ইসি সচিবালয়ে পাঠানোর কথা। যারা এ সময়ের মধ্যে নির্বাচনী হিসাব জমা দেননি, আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে রিটার্নিং অফিসার। এছাড়া যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, তাদেরও হিসাব দিতে হয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, যেসব প্রার্থী দশম সংসদ নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব প্রার্থী হিসাব দেননি এবং যারা নির্দিষ্ট সময়ের পর দিয়েছেন, সবার বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার রিটার্নিং অফিসার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগে. জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, এরশাদ যদি দোষী সাবস্ত হন তাহলে তিনি দুই থেকে সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও অর্থদন্ডে দন্ডিত হতে পারে। এছাড়া আদালত কারাদন্ড দেন তাহলে সংসদ সদস্য পদও হারাতে পারেন তিনি।
উল্লেখ্য, ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গেজেট প্রকাশ হয় ৮ জানুযারি। এর পরবর্তী এক মাসের অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রত্যেক প্রার্থীর ব্যয়ের রিটার্ন জমা দেয়া ছিল বাধ্যতামূলক। এ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৫৪৩ জন। তাদের মধ্যে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, বাকি ১৪৭ আসনে ৩৯০ প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
ঢাকা, ৯ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) কেবি





