১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে। প্রতিষ্ঠার ৩ যুগ পেরিয়ে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম আর চড়াই- উতরাইয়ের পথ পরিক্রমায় বিএনপি আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।

দলটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায়, সদ্য স্বাধীন দেশে অনৈক্যের অবসান করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনিই প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, বাংলাদেশের মতো সদ্য স্বাধীন একটি দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।

আর এ অনুভূতি থেকেই তিনি শ্রেণী, পেশা, ধর্ম, বর্ণ ও মত নির্বিশেষে রাজনৈতিক কর্মী, নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষের এক অভূতপূর্ব সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন বিএনপিতে।

উন্নয়ন-উৎপাদনের রাজনীতিকে মূল প্রতিপাদ্য ঘোষণা করে ১৯ দফা কর্মসূচির আলোকে প্রতিষ্ঠার ৫ মাসের মাথায় ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০০টি আসন লাভ করে রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে দলটি।

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর বিপথগামী একাংশের হামলায়  জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দলটির হাল ধরেন।

সাড়ে ৩দশকে সবচেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও দল গোছানোর ব্যাপারে নিজেদের নামের প্রতি খুব একটা সুবিচার করতে পারেনি তারা।

সাংগঠনিকভাবে শক্তি অর্জনের চেয়ে জনগনের দল হিসেবেই পরিচিতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। যার ফলে দেশের জনগণও যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই ক্ষমতায় বসিয়েছে দলটিকে। এজন্য বিএনপি জনগণের ভোটে সর্বাধিক ৪বার রাস্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে।

সর্বশেষ ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ৫ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৬ সালের অক্টোবরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন।

১/১১-এর পালাবদলের পর বিএনপিকে প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন বেগম খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র তারেক রহমান। ১/১১-এর অবসান হয়। পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবে আরো নাজুক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

২০১১ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার উচ্চ আদালতের নির্দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দেয়। এর পূণর্বহালের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। কিন্তু দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকার পরও দলের সাংগঠনিকলেজেগোবরে অবস্থা বিশেষ করে ঢাকার রাজপথে ব্যর্থতার কারণে আন্দোলনে সফল হয়নি দলটি।

এ বিষয়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব) মাহবুবুর রহমান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ গঠন করার জন্য। দেশের একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সবসময় জনগণের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। তবে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিএনপির ওপর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

অন্যদিকে ৫জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের এক সপ্তাহের মাথায় সরকারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে ইতি টানে বিএনপি। বিদেশি কূটনৈতিকদের চাপে এবং জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাপনের কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেয় দলটির হাইকমান্ড। একই সাথে দল  গুছিয়ে আন্দোলনে নামার ঘোষণাও দেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৮ মাস পার হলেও রাজপথে তেমন কোনো আশানুরূপ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি দলটি।

৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেও এখনও বিএনপিকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিজেদের প্রধান প্রতিপক্ষ বলে মনে করে। বিরোধী দলে না থাকলেও বর্তমান সরকারের সব রাজনৈতিক আলোচনায়, সংসদে বক্তৃতার একটি বড় অংশ জুড়ে তাই থাকে বিএনপির প্রসঙ্গ। জনগণের প্রত্যাশারও অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এ দলটি।

এদিকে, জাতীয় কাউন্সিলের সময় পার হয়ে গেলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব হয়নি। সারাদেশের বিভিন্ন জেলার কমিটি গঠন করা যায়নি এখনো। মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ারের মৃত্যুর পর পূর্ণ মহাসচিবও নিয়োগ দিতে পারেনি দলটি।

আন্দোলনে সবসময় সামনের সারিতে থাকা সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের জন্য যোগ্য নেতা খুঁজে পাচ্ছেন না দলের চেয়ারপারসন। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে সাদামাটা কর্মসূচি দিয়েই ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে দলটি। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রতিষ্ঠা থেকেই বিএনপি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জনগণের অধিকার আদায়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মহান দিনে দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদেরকে শপথ নিতে হবে যে, দেশের যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে ঐক্যবদ্ধ থেকে সকল অপশক্তিকে রুখে ‍দিতে হবে।

একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে সুদীর্ঘ ৩৬ বছর বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে টিকে থাকা খুব সহজ কথা নয়। বিএনপি এই কঠিন কাজটি করতে পেরেছে তার গণমুখী ভূমিকা বজায় রাখার মাধ্যমে এবং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে। এই দল কখনো দেশ শাসন করেছে, আবার কখনো নিয়মতান্ত্রিক বিরোধীদলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, কখনোবা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী দিনগুলোতে বিএনপি দেশ ও জাতির  কল্যাণে তার যুগোপযোগী ভূমিকা অব্যাহত রাখবে, এই প্রত্যাশা রইলো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে।

ঢাকা, এমএইচ, ৩১ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, কেএইচ