ক্ষমতাসীন দলের সংগঠন ছাত্রলীগের সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে গণজাগরণ মঞ্চে যে ভাঙন শুরু হয়েছিল, তা এখন চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। আওয়ামীলীগও চায় না গণজাগরণ মঞ্চ আর টিকে থাকুক। প্রয়োজন ফুরিয়েছে বহুল আলোচিত গণজাগরণ মঞ্চের।
ছাত্রলীগ সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরামর্শে ছাত্রলীগ প্রথম দিনই এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই জাগরণকে কাজে লাগানো এবং যাতে কোনো ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। আবার সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরামর্শেই তারা পরে আন্দোলন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। কারণ, এখন আর গণজাগরণ মঞ্চের দরকার নেই, তাদের ছয় দফা পথ হারিয়েছে।
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি আবদুল কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে ব্লগারস অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহ্বানে শাহবাগে এ আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা গণজাগরণ মঞ্চ হিসেবে পরিচিতি পায়। এর মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পান রংপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ডা. ইমরান এইচ সরকার। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ছাড়া সব কটি ছাত্রসংগঠন এই আন্দোলনে যোগ দেয়। সরকারের পক্ষ থেকেও তাদের নানাভাবে সহায়তা দেওয়া হয়। আর এখন কার্যত ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্টের একাংশ ছাড়া আর কোনো ছাত্রসংগঠন ইমরানের সঙ্গে নেই।
সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠনগুলোর একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফাঁসি কার্যকর ও জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধসহ গণজাগরণ মঞ্চের ছয় দফা দাবির বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে ইমরানের মন্তব্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, দল গঠনের চিন্তা, আর্থিক লেনদেন নিয়ে অস্পষ্টতা গণজাগরণ মঞ্চে ভাঙন ধরাতে সহায়তা করেছে। আর এই বিষয়গুলো ব্যবহার করেই আড়ালে থেকে ভাঙন ত্বরান্বিত করার সুযোগ পেয়েছে ছাত্রলীগ।
'গণজাগরণ মঞ্চের' পতন যেভাবে : শুরু থেকেই বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়ার ক্ষেত্রে মঞ্চের মুখপাত্রের সঙ্গে ছাত্রলীগের কিছু মতভিন্নতা দেখা দেয়। ছাত্রলীগ চেয়েছিল ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের বিল পাস হওয়ার পর আন্দোলন গুটিয়ে নিতে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এসে ছাত্রলীগ বুঝতে শুরু করে, তারা মঞ্চকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। গণজাগরণ মঞ্চ নিজেদের আলাদা একটি শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে। গত বছরের ১৩ মার্চ চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সঙ্গে মঞ্চের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগ চেয়েছিল ওই সমাবেশ না করতে। কিন্তু ছাত্রলীগকে অনেকটা অন্ধকারে রেখে মঞ্চ সমাবেশ করতে চেয়েছিল। এরপর ২৬ মার্চ মহাসমাবেশ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে যাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা এবং সরকারবিরোধী কিছু স্লোগানকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সঙ্গে দূরত্ব প্রকাশ্যে আসে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইফসুফ বাচ্চুকে বাগিয়ে নেয়ার ফলে ইমরানে গ্রুপটি সরকারের কাছেও বেশ গ্রহণযোগ্যতা পায়। পাশাপাশি মঞ্চের ক্ষুব্ধ কর্মীদের চেয়ে শক্তিশালী একটি গ্রুপ তৈরি করেন তিনি। তার এই কাজে তিনি পরামর্শক হিসেবে পাশে পান নাসির উদ্দীন ইফসুফ বাচ্চুকে। তাকে সঙ্গে রেখে মঞ্চে একক আধিপত্য বিস্তারের দিন দিন এগুতে থাকেন ইমরান। তাকে ‘পরামর্শ’ এবং ‘ছায়া’ দিয়ে বাচ্চুও বেশ লাভবান হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রমতে, শক্তিশালী পক্ষ করার পর ইমরান এইচ সরকার আরও স্বেচ্ছাচারী এবং বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। আগে গণজাগরণ মঞ্চের সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে কর্মসূচি বা যে কোনো বিষয়ে অল্পস্বল্প আলোচনা করলেও পরে তা বন্ধ করে দেন। তিনি নিজে নিজে সমস্ত প্ল্যানিং করতেন। অবশ্য তার এ কাজে অদৃশ্য থেকে কেউ সাহায্য করতেন। পরে তিনি হাতে নেন মাস্টার প্ল্যান। গণজাগরণ মঞ্চকে ব্যবহার করে ‘রাজনৈতিক স্বার্থ’ হাসিলেও মনোনিবেশ করেন। কর্মসূচিসহ সব ধরনের কাজে একক ইচ্ছা, সর্বজনীন নেতৃত্ব দানে ব্যর্থতা এবং জবাবদিহিতা না থাকার কারণে গত বছরের শেষ দিকেই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নেয়।
প্রায় এক বছর চেপে রাখা ক্ষোভ জেগে ওঠে সাধারণ কর্মীদের মাঝে। তারা ইমরানের বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করা শুরু করেন। আর এতে তৈরি হয় সমস্যার। ‘ক্ষমতা’ আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য ক্ষুব্ধ কর্মীদের দূরে রাখার চেষ্টা করেন ইমরান। নিজ পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের বিভিন্ন সময় ব্যবহার করেছেন ‘সন্ত্রাসী’দের মতো করে। অন্যপক্ষ এবং ক্ষুব্ধ সাধারণ কর্মীদের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন সাময়িকভাবে নির্বাচিত হয়ে পুরোপুরিভাবে টিকে থাকা মঞ্চের মুখপাত্র। এসব কারণে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের মনোবল ভেঙে যায়। একসাথে হাতে হাত রেখে পথচলা মানুষটি যখন অর্থবিত্ত আর ক্ষমতার জন্য স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেন, তখন হতাশা আর ক্ষোভে আচ্ছন্ন হয় সাধারণ কর্মীরা।
ছাত্রলীগ সূত্র আরও জানায়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে গণজাগরণ মঞ্চের রোডমার্চ, নির্বাচন নিয়ে ইমরানের মন্তব্য, ঘরোয়া আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইমরানের বক্তব্য, লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের জন্য ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার সমালোচনা—এসব বিষয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ আমলে নেয়। এ সময় ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মী ফেসবুকে ইমরান এইচ সরকার ও গণজাগরণ মঞ্চের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে থাকেন।
একই সময়ে ছাত্রলীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত মঞ্চেরই একটি অংশের সঙ্গে ইমরান পক্ষের বিরোধ জোরালো হয়। ছাত্রলীগ আন্দোলন থেকে সরে আসার পর মঞ্চের একটি অংশ গৌরব ’৭১ নাম নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। এই অংশটি ছাত্রলীগ-সমর্থিত হিসেবে পরিচিত। গত বছরের ২ আগস্ট গণজাগরণ মঞ্চের আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলাকালেই তারা জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ ব্যানারে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। ওই সময়ই ইমরান এইচ সরকার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এই কর্মসূচি গণজাগরণ মঞ্চের নয়।
সাধারণত যে জায়গায় গণজাগরণ মঞ্চ অনুষ্ঠান করে, সেই জায়গায় গৌরব ’৭১-এর নামে মঞ্চ তৈরি করা হলে এদের সঙ্গেই ৩ এপ্রিল রাতে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের দুই দফা মারামারির ঘটনা ঘটে। এই অংশটি ইমরানকে শাহবাগে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।
বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অংশটিকে ছাত্রলীগ সমর্থন দিয়েছে। ৩ এপ্রিলের সংঘর্ষের ঘটনায় সরাসরি ছাত্রলীগের কোনো নেতা-কর্মী যুক্ত ছিলেন না। তবে ইমরান এইচ সরকার এ জন্য যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দুজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে ছাত্রলীগ বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে নিয়ে ভাঙন চূড়ান্ত করার সুযোগ পায়। সমমনা ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ছাত্রলীগ। এর ফলে ছাত্র মৈত্রী, ছাত্রলীগ (জাসদ), ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র সমিতি ও ছাত্রঐক্য ফোরাম সংবাদ সম্মেলন করে তাদের অবস্থান তুলে ধরে। এর মধ্যে প্রথম চারটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক চারটি দলের ছাত্রসংগঠন। যদিও এর আগে মুখপাত্র বদলের একটি চেষ্টা করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
ওই সংবাদ সম্মেলনে গণজাগরণ মঞ্চকে ব্যবহার করে ইমরান এইচ সরকারের রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টার দিকে ইঙ্গিত করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কেউ যদি ভিন্ন কোনো উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন দেখে থাকেন, তবে গণজাগরণ মঞ্চের ভেতরে থেকে নয়, বরং মঞ্চ থেকে বাইরে গিয়ে সেই স্বপ্ন তাঁকে দেখতে হবে।
'স্বেচ্ছাচারী ইমরানের' রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা: একসময় ইমরানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন—মঞ্চের একাধিক সংগঠক ও ছাত্রনেতারা বলেন, গত বছরের জুন-জুলাই থেকে মঞ্চকে একটি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ দেওয়ার চিন্তা শুরু করেন ইমরান এইচ সরকার।
গৌরব ’৭১-এর সাধারণ সম্পাদক এফ এম শাহীন বলেন, "৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর 'স্বেচ্ছাচারী ইমরানের' এ চিন্তা আরো জোরালো হয়"।
তবে এ বিষয়টি অনেকটা এড়িয়ে ইমরান সরকার বলেন, দল গঠনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ভবিষ্যতের ব্যাপার বলা কঠিন। তবে সত্যিকারভাবে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে—এমন সব শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে চান। দল গঠনের বিষয়ে বিশিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি দাবি করে ইমরান আরও বলেন, দেশের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়, তাঁদের মতামত নেন। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে মঞ্চ একটি স্বাতন্ত্র্য অবস্থান তৈরি করেছে। এ অবস্থান কেউ কেউ নিজেদের জন্য হুমকি মনে করছেন।
শত কোটি টাকার আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ: ইমরানবিরোধীদের অভিযোগ, মুখপাত্রের একনায়কতান্ত্রিক আচরণ ও ইমরান সরকারের শতকোটি টাকার আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে গণজাগরণ মঞ্চে বিভক্তি আসে। মঞ্চের সংগঠক ও ছাত্রনেতা এফ এম শাহীন বলেন, ইমরান দেশী ও প্রবাসী বাঙ্গালীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহের মাধ্যমে আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে সংগৃহীত চাঁদার পরিমাণের একটি তালিকা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসুর উপস্থিতিতে ইমরান এইচ সরকারকে পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা এসপি মাহবুব চার লাখ টাকা দিয়েছেন বলে উল্লেখ আছে। বাপ্পাদিত্য বসুও এই লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এ ছাড়া গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রবাসীদের চার লাখ ৭৮ হাজার ৬৮৩ টাকা ইমরান এইচ সরকারের হাতে দেওয়া হয়; যা পরদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
এখন পর্যন্ত এই আন্দোলনে কত টাকা এভাবে অনুদান এসেছে, জানতে চাইলে ইমরান বলেন, তাঁরা কখনো টাকা সংরক্ষণ করেননি। কমিটি টাকাকে ‘লজিস্টিকে কনভার্ট’ করেছে। আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট আয়-ব্যয়ের হিসাব তিনি দিতে পারেননি।
এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিজের চাকরি ছেড়ে দেন ইমরান এইচ সরকার। এখন তিনি কীভাবে চলেন, জানতে চাইলে ইমরান বলেন, তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মেসে থাকেন। খরচ চালানোর সামর্থ্য তাঁর পরিবারের আছে।
তবে এসব অভিযোগে কিছু অংশের সঙ্গে একমত হয়েছেন মঞ্চের অন্যকম সংগঠক ও ছাত্রমৈত্রী কেন্দ্রীয় সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু। তিনি বলেন, ‘ইমরানের বেশকিছু দোষ রয়েছে। কর্মসূচি কিংবা যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইমরান একাই একশ’। তিনি অন্য কারো সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন মনে করেন না। মঞ্চের মুখপাত্রের জবাবদিহিতা না থাকা এবং সার্বজনীন নেতৃত্বধানে ব্যর্থতাই সবকিছুর জন্য দায়ী।’
ঢাকা, ১১ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস