বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, পথহারা এই বাংলাদেশ ক্রমেই গভীর খাদে চলে যাচ্ছে। এখান থেকে টেনে তুলতে হবে। দেশপ্রেম নিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে। তাকে পুর্নজন্ম দিতে হলে বিভক্তি বাদ দিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দৃঢ়তা, ঈমান ও মনোবল নিয়ে অধিকার হারা জাতিকে অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। অধিকার কেউ বাড়ী এসে দিয়ে যায় না, লড়াই করে আদায় করে নিতে হয়।
তিনি চিন্তা ও কর্মসূচির ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি মিলনায়তনে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা ট্রাজেডিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়ায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ। আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য আব্দুস সবুর ফকির, অধ্যাপক মোকাররম হোসাইন, সদস্য কামাল হোসাইন, আব্দুস সালাম প্রমুখ।
বক্তব্যের শুরুতে ডা: শফিকুর রহমান পিলখানায় যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের জন্য দোয়া করে বলেন, বাংলাদেশ প্রকৃত পক্ষে পথ হারিয়েছে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। লগি বৈঠার তাণ্ডবের মাধ্যমে সেদিন গণতন্ত্রের মত্যু হয়েছিল। এটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সেদিন উগ্র কর্মী বাহিনীকে লগি বৈঠার কথা বলে উস্কানী দেয়া হয়েছিল। এটা জাতির সামনে ঘটানো হয়েছিল। সেই পথ হারা দেশ আজও সঠিক পথে ফিরে আসতে পারেনি।
তিনি বলেন, সেই ধারাবাহিকতায় বিশেষ মহল ক্ষমতায় আসে। তারই ২ মাসের মাথায় পিলখানার জঘন্য হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড কেন ঘটানো হয়েছিল, জাতি আজও তা জানতে পারেনি।
জামায়াত আমির বলেন, সেই দিন ৫৭জন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হলো। কারো কারো পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল, পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছিল। সেই দিন জাতির বড় সর্বনাশ হয়েছিল। কারণ কোনো সম্মুখযুদ্ধেও এতো সেনা অফিসার একসাথে মারা যায়নি।
তিনি বলেন, পিলখানার পাশবিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে দু’টি তদন্ত কমিটি হয়েছিল। কেন এই হত্যাকাণ্ড হয়েছিল, কারা জড়িত ছিল, জাতি তা জানতে পারেনি।
তিনি বলেন, সেই দিন জামাই আদরে গণভবনে ডেকে এনে বিডিআরের কিছু লোকের সাথে ডায়ালগ করা হয়েছিল, আর সেই সময় অন্যদের বর্বরতা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। কেন উদ্ধার অভিযান না চালিয়ে ডায়ালগ করা হয়েছে? সেই রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলো। কারা বন্ধ করেছিল? খুনিদের নিশ্চিন্তে পালিয়ে যাওয়ারই কী এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল? এরকম হাজারো প্রশ্নের জবাব একদিন আসবে।
তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই চিরাচরিত বদঅভ্যাস রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিএনপির একজন সংসদ সদস্যকে জড়ানো হয়েছিল, তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনি জেলেই মারা গেছেন। একজন করে অপরাধ, আর দায় চাপানো হয়, আরেকজনের ওপর।
তিনি বলেন, একটি দেশপ্রেমিক বাহিনীকে বশংবদ বাহিনীতে পরিণত করার জন্যই এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। কারণ এই বাহিনীর সাথে এমন এমন সাহসী মানুষ রয়েছে, যারা আগ্রাসীদের দাত ভাঙ্গা জবাব দিয়েছে। তাদের বড় প্রয়োজন ছিল এমন একটা বাহিনীকে দুর্বল করে দেয়া, ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে দেয়া।
তিনি বলেন, এই ঘটনার পর বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। আগে নাম ছিল বিডিআর-বাংলাদেশ রাইফেলস। এর সাথে একটা গর্ব, একটা চেতনা জড়িত ছিল। এখন তারা বিজিবি। সীমান্তের চৌকিদার। সেনা বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়া হয়েছে। বিডিআরের চেহারা পাল্টে দেয়া হয়েছে।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে পঙ্গু করার জন্য তাদের দ্বিতীয় টার্গেট হিসেবে, দেশপ্রেমিক সেনা বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনীর পরই যারা দেশের স্বার্থের ব্যাপারে, পরাশক্তির কাছে, আগ্রাসীদের কাছে কখনো মাথানত করেনি, সেই দেশপ্রেমিক দল জামায়াতে ইসলামীর ওপর আঘাত হানা হয়।
তিনি বলেন, একই টেবিলে বসে খাওয়া দাওয়া হলো, একই সাথে কর্মসূচি পালন করা হলো, ৪০ বছর পর হঠাৎ তারা বড় অপরাধী হয়ে গেলো?
তিনি বলেন, তাদের এলাকার মানুষ তাদেরকে ভালো মানুষ হিসেবে জানে। এরকম জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে শেষ করে দেয়া হয়। জামায়াতকে আইসোলেট করার জন্য ষড়যন্ত্র করে।
তিনি আরো বলেন, আমরা তখন বলেছিলাম, আমাদের ওপর বিপদ আসলেও আসুন সবাই মিলে এই বিপদের মোকাবেলা করি। কিন্তু তখন আমাদের কথায় কেউ কর্ণপাত করেনি। এখন সবাই বিপদে রয়েছে।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা অঙ্গিকার করছি, জাতির ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আপোষহীন নির্মোহ ভূমিকা অব্যাহত রাখবে। জামায়াত সাময়িক কোনো ফায়দা হাসিলের জন্য কারো সাথে আপোষ করবে না। আমাদের গর্ব, আমরা এমন এক নেতৃত্ব পেয়েছিলাম, যারা হাসি মুখে ফাঁসির রশি গ্রহণ করেছেন। আমরা তাদেরই উত্তরসুরি। এই আমানতের ভার বহন করে জাতিকে মুক্ত করতে পারি, আল্লাহ যেন আমাদের সেই তাওফিক দান করেন।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বর্তমান সরকার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাসের মাথায় পিলখানায় ৫৭ জন সেনা অফিসারকে হত্যা করা হয়। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও এতো সেনা অফিসার মারা যায়নি। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। সেই দিন হত্যাকারীদের কেন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিল? বিপুল সংখ্যক চৌকস কমান্ডো থাকার পরও কেন উদ্ধার অভিযান চালানো হয়নি? এ নিয়ে রহস্য রয়ে গেছে। এ রকম অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই। দেশকে রক্ষা করতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যেতে হবে।
মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, আমরা আলোচনা করি কী ঘটেছিল, তা নিয়ে। কিন্তু কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল, সেই রহস্য আজও উদঘাটন করা হয়নি। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর ওপর অনেক আঘাত এসেছে। অনেক সেনা সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে, গুম করে দেয়া হয়েছে, নিখোঁজ করে দেয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য জনগণকে খুঁজে বের করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ৫৭ জন সেনা অফিসারসহ ৭৪ জনকে জীবন দিতো হলো। এর সত্য উদঘাটন করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্য নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কময় একটি দিন। ২০০৯ সালে এই দিনে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দফতরে বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এই ঘটনা সংগঠিত হয়। এই ঘটনায় দেশ ও জাতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবার নয়।
তিনি বলেন, ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক অধ্যায় দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরি সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়েছে। অপরদিকে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে এদেশের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ধ্বংস করে দিয়ে আমাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সীমানাকে অরক্ষিত করে দেয়ার নীলনকশা আঁকা হয়েছে।
তিনি বলেন, হত্যাকারীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে দেশপ্রেমী সেনা কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবার-পরিজনদের হত্যা ও নির্মম নির্যাতনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। রাজধানীর উপকণ্ঠে ইতিহাসের জঘণ্যতম হত্যা ও নিধনযজ্ঞ চালালেও সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
তিনি বলেন, দেশকে রাজনীতি শূন্য করার জন্য জামায়াত নেতৃবৃন্দকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার নেই। দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করতে হলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
এমআর





