সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলরুমে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, আজ যারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের নামে জনগণের সম্পদ বিদেশে পাচার করছেন, দুর্নীতি ও অনিয়ম করছেন, তারা সবাই শিক্ষিত চোর-ডাকাত। তারা প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করেননি, বরং সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন।

তিনি বলেন, সার্টিফিকেট অর্জননির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে রাসুল (সা.)-এর ইসলামী শিক্ষানীতির আলোকে দেশে শিক্ষানীতি তৈরি করতে হবে। প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আলোকিত মানুষ তৈরি সম্ভব নয়।

দিবস পালন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দিবস পালন করে মানুষের কোনো কল্যাণ সাধন হয়েছে- ইতিহাস তা বলে না। দিবস উপলক্ষে যেসব আলোচনা হয়, সেগুলো পত্রিকার পাতায় থেকে যায়। বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে দেশ, জাতি ও জনগণ কেউ উপকৃত হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, “আজকের এই আলোচনা হতে হবে শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার শেষ আলোচনা। আগামী বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হতে হবে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে।” শিক্ষক সমাজের সব যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রফেসর ড. ইলিয়াস মোল্লা এমপি বলেন, একজন চিকিৎসক একজন রোগীকে সুস্থ করে তোলেন, একজন প্রকৌশলী একটি অবকাঠামো গড়ে তোলেন। কিন্তু একজন শিক্ষক পুরো একটি জাতিকে গড়ে তোলেন।

তিনি বলেন, শিক্ষক সমাজ বরাবরই অবহেলিত ও বঞ্চিত। “আমরা শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দিতে পারিনি -এই বক্তব্য আর কতদিন দিতে হবে?”—প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, তাঁর প্রত্যাশা এই বক্তব্য আজকেই শেষ হবে।

আগামী বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে যাতে বুক ফুলিয়ে বলা যায়, শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া সম্ভব হয়েছে -এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম বলেন, শিক্ষকরা সবচেয়ে সম্মানিত পেশায় নিয়োজিত থাকলেও দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাংলাদেশে গুটিকয়েক শিক্ষক ছাড়া ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ -এমন অবস্থাই শিক্ষক সমাজকে বোঝায়।

তিনি বলেন, শিক্ষক জাতির বিবেক হলেও তারা সচ্ছলভাবে চলতে পারেন না। স্বৈরাচার সরকারের আমলে শিক্ষকরা যৌক্তিক দাবিতে অনেক আন্দোলন করলেও তাদের কোনো দাবি পূরণ করা হয়নি। বরং শিক্ষকদের রক্ত রাজপথে লেগে আছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিদায় হওয়ার পর নতুন বাংলাদেশেও শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো এখনো পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি অধ্যাপক নুর নবী মানিকের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি অধ্যাপক রবিউল ইসলামের পরিচালনায় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

এতে আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল মান্নান, মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদের জয়েন্ট সেক্রেটারি ড. মাওলানা আব্দুস সবুর মাতব্বর, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ সৈয়দ আব্দুল আজিজ প্রমুখ।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর নবী মানিক শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১০ দফা দাবি উপস্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো-

  • ১. স্থানীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ অব্যাহত রাখতে হবে এবং কোনোভাবে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না।
  • ২. এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি অনতিবিলম্বে জাতীয়করণ করতে হবে।
  • ৩. শিক্ষকদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করায় অবসর গ্রহণের বয়স ৬৫ বছর করতে হবে।
  • ৪. এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ বাড়িভাড়া, উৎসবভাতা ও চিকিৎসাভাতা চলতি অর্থবছরেই সরকারি নিয়মে প্রদান করতে হবে।
  • ৫. অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ দ্রুত প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক কল্যাণ তহবিলের অর্থের ঘাটতি নিরসনে প্রতি বছরের বাজেটে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।
  • ৬. এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে যোগ্য ও মেধাবীদের আনুপাতিক হারে শিক্ষা প্রশাসন ও সরকারি বিভিন্ন দফতরে নিয়োগ দিতে হবে।
  • ৭. এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একইভাবে কর্মচারীদেরও বদলির সুযোগ দিতে হবে। অনতিবিলম্বে বদলি ব্যবস্থা কার্যকর করতে সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • ৮. বিদায়ী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে মিথ্যা মামলার কারণে যেসব শিক্ষক-কর্মচারীকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের প্রাপ্য বকেয়া পরিশোধ করতে হবে।
  • ৯. ৯ম জাতীয় পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে একই সময়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্যও বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • ১০. সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ও ৪৯তম বিসিএস নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনায় যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। সকল সরকারি নিয়োগে দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে।

এনএইচ