বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ৩০ মে। তিনি ১৯৮১ সালের আজকের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে নিহত হন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুধু একটি নাম নয়, তিনি একটি ইতিহাসও বটে। তার নাম বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।
মুহাম্মদ মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুনের দ্বিতীয় পুত্র শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাঘাবাড়ী গ্রামে তার পিতামহের বসত বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার শিশুকাল এবং শৈশবের প্রথম অধ্যায় কেটেছে এই বাঘাবাড়ি গ্রামেই।
জিয়াউর রহমানের ডাকনাম ছিল কমল। কমল অর্থ পদ্ম। পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান এবং মাতা জাহানারা খাতুনের বড় আদরের সন্তান ছিলেন এই কমল। তার পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান এবং মাতা জাহানারা খাতুনের নিবিড় পরিচর্যায় বড় হয়ে উঠলেও তার সাথে তার পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল এবং তার মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রত্যক্ষ প্রভাব জিয়াউর রহমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর লক্ষ্য করা যায়। ধার্মিক এবং ব্যাক্তিত্ববান পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিনের সাহচার্যে কাটে তার শিশুকাল।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বয়স যখন ৪ বৎসর তখন থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাতায়াত শুরু করেন। এই সালটি ছিল ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ। কারণ শহীদ জিয়ার পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল স্কুলে অর্থাৎ যে স্কুলে শহীদ জিয়ার হাতে খঁড়ি সেই বাঘাবাড়ি মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শহীদ জিয়ার হাতে খড়ি হয় তারই পিতামহের হাতে। বাগাবাড়িতে তিনি ছিলেন ছোট কমলের প্রথম শিক্ষা গুরু।
সেই সূত্রে জিয়াউর রহমানের সৌভাগ্য যে তিনি তার পিতামহের কাছ থেকে জীবনের বিভিন্ন বিষয় ও বস্তুনিষ্ট মূল্যায়ন করতে শিখেছিলেন। এরপর ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তার পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান তার পরিবারকে কোলকাতায় নিয়ে যান। তখন শহীদ জিয়ার বয়স ৬ বছর। তাকে ভর্তি করা হয় পার্ক সার্কাসের আমীন আলী এভিনিউতে অবস্থিত শিশু বিদ্যাপীঠে।
এক বছর এই স্কুলে তিনি পড়াশুনা করার পর আবার নিজ গ্রাম বগুড়ার বাগবাড়িতে ফিরে যায় তার পরিবার। বগুড়ার বাগবাড়ী গ্রামে পিতামহের বসত বাড়ীতে শহীদ জিয়ার আর একটি বছর কাটে। আবার বাগবাড়ি মাইনর স্কুলে এক বছররের জন্যে ভর্তি হন শহীদ জিয়া।
এরপর শহীদ জিয়ার পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। শুরু হয় নতুন উদ্দীপনায় আবার এক নতুন জীবন চলা। সালটি ছিল ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ। শহীদ জিয়াকে তখন কলকাতায় কলেজ স্ট্রীটের হেয়ার স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে দেয়া হয়। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত শহীদ জিয়া হেয়ার স্কুলেই লেখাপড়া করেন।
১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর শহীদ জিয়ার পিতা মো: মনসুর রহমানের সরকারী চাকরি সূত্রে পরিবার পরিজন নিয়ে পাকিস্তানের করাচীতে চলে আসেন। শহীদ জিয়াকে ১৯৪৮ এর ১ জুলাই ভর্তি করে দেয়া হয় করাচী একাডেমি স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে। বর্তমানে সেই স্কুলের নাম তাইয়ের আলী আলভী একাডেমি। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যোগদান করেন পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে। শুরু হয় তার জীবন সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।
১৯৫২ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন করাচিতে ‘করাচি একাডেমি স্কুল’ (বর্তমানে, তাইয়েব আলী আলভী একাডেমী) থেকে। ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি ভর্তি হন করাচির ‘ডি জে কলেজে’। ১৯৫৩ সালে ‘পাকিস্তান সামরিক একাডেমি’তে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন।
২৫ মার্চের কালরাত্রিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যখন এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বরের মতো ঘৃণ্য হামলা চালায় তখন এর আকস্মিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে সবোর্স্তরের জনগণ। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামস্থ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।
১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তিন সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন। তিনি সেনা সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তীতে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধপরিচালনা করেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান যুদ্ধের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭১ এর জুন পর্যন্ত ১ নং সেক্টর কমান্ডার ও তারপর জেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। অসীম সাহসিকতা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্বে তিনি ছিলেন নির্ভীক।
যখন রাজনৈতিক নেতারা সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলেন, তখন সেনাবাহিনীর একজন মেজর এসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন; জীবনবাজি রেখে সশস্ত্র যুদ্ধ করেন। সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন; বীর উত্তম খেতাব পান। স্বাধীনতার পর তিনি ফের সৈনিক জীবনে ফিরে যান। সেনাবাহিনীতে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর প্রথমে তিনি কুমিল্লা ব্রিগেড কমান্ডার এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চীফ-অফ-স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালে কর্নেল, ১৯৭৩-এর মাঝামাঝি ব্রিগেডিয়ার এবং শেষ দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান এ দেশের মানুষের কাছে প্রথম পরিচিত হলেও পরে তিনি বাংলাদেশের একজন বরেণ্য রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন। যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশকে রাজনৈতিক ঐকতানে নিয়ে আসা ও সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কারণে তিনি আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে আখ্যা পান।
তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনের মধ্যদিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির সূচনা করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নতুন দর্শন উপস্থাপন করেন জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে যান।
তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি দেশের মানুষের প্রিয় দল হিসেবে ’৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ, ’৯১ সালের পঞ্চম সংসদ ও ষষ্ঠ এবং অষ্টম সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত ’৮৬ সালের তৃতীয় ও ’৮৮ সালের চতুর্থ এবং এছাড়া সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন মহাজোটের অধীনে অনুষ্ঠিত একতরফার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ দল। এই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল না। বাকি ১৪৭ আসনের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল বলে বিভিন্ন সংগঠন দাবি করে। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটসহ অন্যান্য বিরোধী দলও এই নির্বাচন বর্জন করে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে সার্কিট হাউসে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতীক। দেশ, মাটি ও মানুষের জন্যে আমৃত্যু নিবেদিতপ্রাণ এই ব্যক্তিত্বের পরিচিতি সর্বজনবিদিত। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, অসাধারণ দেশপ্রেমিক, অসম সাহসী ও সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
এমএইচ/ এআর





