ক্ষমতাসীনরা নিজ দলের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক। তিনি বলেছেন, আমাদেরকে সত্য কথা বলতে হবে। জতির কাছে সত্য প্রকাশ করা অমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে দেশ ও জাতির উদ্দেশ্যে তিনি এ বক্তব্য দিয়েছেন। তার এই বক্তব্যটি হবহু তুলে ধরা হলো:
মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নামে বক্তব্য শুরু করে মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বিশেষভাবে স্মরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, তাজউদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম ও আতাউল গণি ওসমানী প্রমুখ জাতীয় নেতৃবৃন্দকে।
তিনি বলেন আল্লাহকে ভয় করলে সত্য কথা বলতে হবে রাজনীতিতে এখন মিথ্যা বলা, চাটুকারিতা ও কপটতা দক্ষ হতে হয়। দেশের উচ্চপদস্থ এখন রাজনীতিতে সত্য বলা পছন্দ করেন না। কিন্তু দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমাদেরকে সত্যপ্রকাশের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর এই সত্য প্রকাশের দায়িত্ব অনুভূতি থেকেই আমার আজকের এই বক্তব্য।
তিনি তার বক্তব্যে বলেন, একটি স্বাধীন সার্বভৌম শান্তিপূর্ণ আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিল, লক্ষ লক্ষ তরুণ শত্রুর গুলির মুখে বুক পেতে দিয়েছিল।
তিনি বলেন ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল কলকাতায় যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়েছিল, তাতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে, "সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সেই ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমাদের সমবায় গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি।"
তার মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত ৪৯ বছরে উক্ত ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তিনটি বিষয়ের ভিডিও অতীতের সরকারগুলো তেমন কোন গুরুত্ব দেয়নি।
তিনি বলেন অতীতের সরকারগুলো দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে স্বল্পমেয়াদী স্বার্থকে বেশি হাইলাইটস করেছে।
ক্ষমতাসীন দলগুলো দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজ দলের স্বার্থ কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় তিনি জানান, নিকটতম আগামী জাতীয় নির্বাচনে তার দল বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ৫০টি আসনের নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে তিনি সরকারের প্রশংসা করেন। এছাড়াও তিনি আরো কয়েকটি বিষয়ের সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। বিশেষ করে, ১৯৯৬ সালে ভারতের সাথে করা ৩০ বছর মেয়াদি "গঙ্গার পানি চুক্তি"। যদিও চুক্তি অনুযায়ী ভারত পানি দিচ্ছে না বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, এরা "পার্বত্য শান্তি চুক্তি" করেছে, যদিও তা শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি।) সমুদ্রসীমা বৃদ্ধি করেছে (যদিও সেখানে তেল অনুসন্ধানে বিদেশি হস্তক্ষেপ রয়েছে।) অসহায় নির্যাতিত রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় প্রদান (যদিও তাদের ফেরত পাঠাতে কূটনৈতিকভাবে সরকার ব্যর্থ।)
কাশ্মীর প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে সমর্থন করলেও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে ভারত বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, দেশে শিশুমৃত্যু হার কমেছে। দুর্নীতি সত্বেও দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। দেশের মানুষের নৈতিকতায় মারাত্মকভাবে ধ্বস নেমেছে।
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে উইপোকা ধরা খেয়েছে মর্মে প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন তার সাথে একমত হয়ে তিনি দুর্নীতির রাঘববোয়ালদের আটকের দাবি জানান।
তিনি বলেন, দেশে খুন, ধর্ষণ, গুম, নারীর প্রতি সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের ভারসাম্যহীনতা ও বিদেশে টাকা পাচার বেড়ে চলছে।
ক্ষমতাসীনরা এখন "টাকা মারো, পালিয়ে যাও", "তদবির করো, টাকা কামাও" নীতি অবলম্বন করছে।
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজরা যাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে সেই সুযোগ রেখে বর্তমানে অভিযান চালানো হচ্ছে।
গত ১২ বছরে দেশে যে দুর্নীতি হয়েছে তার বিচার কে করবে এবং গত ২৫ দিনে যে সকল দুর্নীতিবাজ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে তাদের বিচার কে করবে বলেও তিনি প্রশ্ন রাখেন।
২০ দলীয় জোটে ভাঙ্গন সৃষ্টির যে অপচেষ্টা করা হয়েছে তার প্রতিবাদও জানান মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বীরপ্রতীক।
বেগম খালেদা জিয়াকে আটকে রাখার প্রতিবাদ জানান এবং তার মুক্তি দাবি করে তিনি বলেন, উদারতা ও সহনশীলতা নিয়ে দেশ একটি সমঝোতার পরিবেশ গঠনের লক্ষ্যে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বীরপ্রতীক কতিপয় দাবি তুলে ধরেছেন। তা নিম্নরূপ:
১) সহনশীল ও নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হোক।
২) নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নতুন করে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক।
৩) মানবাধিকার লংঘন প্রতিরোধ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সকল স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ন্যায়পাল নিয়োগ করা হোক।
৪) প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা হোক।
৫) চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় দপ্তরগুলো চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হোক।
৬) সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে মেধার গুরুত্ব নিশ্চিত করা হোক।
৭) প্রশাসনের সকল স্তরকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব মুক্ত করা হোক।
৮) শিক্ষাঙ্গন থেকে দলীয় রাজনীতির প্রভাব মুক্ত করে, মেধাশূন্যতা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হোক।
৯) শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে শতকরা এক ভাগ বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়া হোক।
১০) মাদ্রাসা শিক্ষার বৈষম্য দূর করার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
১১) জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নীতি নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা প্রত্যক্ষ ও বলিষ্ঠ করা হোক। জাতীয় নিরাপত্তা সেলকে শক্তিশালী করা হোক।
১২) বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গার্মেন্টস শিল্প ছাড়াও অন্য তিনটি সেক্টর, যথাঃ তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানি ও পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হোক।
১৩) তরুণসমাজকে ব্যবসা মুখী করতে সাধারণ শিক্ষার
চেয়ে কারিগরি শিক্ষাকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেয়া হোক।
১৪) দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্য থেকে ৫ থেকে ১০ টিকে বাছাই করে এগুলোর জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়া হোক এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ব্যবস্থা করা হোক।
১৫) ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী ৩০ লক্ষ শহীদের তালিকা করা হোক। এবং জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক। সেখানে স্ব স্ব জেলা বা উপজেলার শহীদদের নামের তালিকা টানানো থাকবে।
১৬) কৃষক ও মেহনতী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হোক।
১৭) সংবিধানের ৬৬ ধারার আলোকে চাকরি ক্ষেত্রে লাভজনক পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হোক।
১৮) পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য; বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করা হোক এবং ভারতের সাথে করা অতীত ও বর্তমানের সকল চুক্তির প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যাসহ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক।
১৯) দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর পুনর্গঠন ও মেধাবী জনবল নিয়োগ করা হোক।
২০) মহান মুক্তিযুদ্ধকালে গৃহীত ও চিহ্নিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সংমিশ্রণে অগ্রসরমান বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক।
২১) রাজনীতিতে ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যাতে বাস্তবসম্মত "নতুন প্রবাহ" চালু হয়, তার একটি আইনানুগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।
তিনি দেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে দেশে একটি স্থিতিশীল ও সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সকল দলের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নেয়ার জন্য তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ২৬ ও ২৭ নং আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশ ও দেশের জনগণের কল্যাণ কামনা করে তিনি তার ফেইসবুক লাইভের দীর্ঘ ৫০ মিনিটের বক্তব্য শেষ করেন।
বক্তব্য শেষে তিনি ফেসবুক কমেন্ট করা সর্বসাধারণের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
উল্লেখ্য, মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বীরপ্রতীক ১৯৪৯ সালের ৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে জন্মগ্রহণ করেন। আজ ৪ অক্টোবর তার ৭১তম জন্মদিন।





