ক্ষোভ রয়ে গেছে আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে। ক্ষোভের কারণ দলের জন্য অনেক ত্যাগ তীতিক্ষা সহ্য করার পরও নেই কোনো দলীয় পদ এবং নেয়া হয় না দলের পক্ষ থেকে কোনো আশানুরূপ খোজ-খবর। তাই অনেক নেতা-কর্মীর মনের মাঝেই দিন কে দিন তৈরী হচ্ছে না বলা ক্ষোভ।
আর মাঝে মাঝে এ ক্ষোভের মাঝেই পড়তে হয় আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের। শুনতে হয় নানা ধরণের অনাকাংখিত কথা। গত ২৮ এপ্রিল এমনই একটি ঘটনার মুখোমুখি হোন সেতু ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ম সদস্য ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগের দপ্তর উপ-পরিষদের বৈঠকের ওবায়দুল কাদেরের সামনে দাড়িয়ে যান এক সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের জিএস রাজা। বিভিন্ন মামলা মোকদ্দমায় জেল খেটে, এরশাদ সরকার থেকে শুরু করে বিএনপির সময় অত্যাচারিত হয়ে আজ মানসিক ভারসাম্যহীন।
ওবায়দুল কাদেরকে রাজা বলেন, কাদের ভাই আজ ৩৮ বছর ধরে কথা বলি না। আজ আমাকে কথা বলতে দিতেই হবে।এরশাদ সরকারের থেকে শুরু করে বিএনপির আমলে অত্যাচারিত হয়ে আমি আজ পাগল। দলের জন্য এতো কিছু করলাম আর আজ আমার এ অবস্থা অথচ কেউ কোন খোজ খবর রাখেনা। এরপরই মানসিক ভারসাম্য হারান রাজা।
রাজার মতো অসংখ্য নেতা-কর্মী রয়েছেন, যারা দলের দূর্দিনে দলের হয়ে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। সবাই হয়তো রাজার মতো মুখ ফুটে তার কষ্টের কথা বলতে পারেন না, কিন্তু মনের ক্ষোভ মনেই পুষে রাখেন এমন সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়।
অনেক সময়ই দেখা যায়, আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম চলছে এমন সময় নেতাদের সামনে এসে কোন এক ব্যক্তি বা মহিলা নেতাদের সামনে এসে জোরে জোরে কিছু কথা বলে আবার নিজে নিজেই চলে যায়। আর এ ঘটনায় নেতারা কিছু মনে করেনে না এবং কিছু বলেনও না। কারণ সবাই জানে এই লোকগুলো দল পাগল, অত্যাচার নির্যাতনে তাদের মানসিক ভারসাম্য একটু কম।
এখনও দেখা যায়, এক সময় ছাত্র লীগের অনেক বড় নেতা ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে পরিচয় দেয়ার মতোও কিছু নেই, বলতে হয় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। যুবলীগ করতেন, এখন পরিচয় দেন সাবেক যুবলীগ নেতা। এমন নেতারা না পারছেন কিছু করতে, না পারছেন কাউকে কিছু বলতে। কোনো রকমে আত্মসম্মান বাঁচিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।তাদের অধস্তন নেতারা যখন উপরোস্ত নেতাদের কাছে যান, তখন তাদেরও লবিং করতে যেতে হয় পদ পাওয়ার জন্য। কিন্তু এক সময় অধস্তনরা তার সাথে লবিং করে দলের পদ পেয়েছেন, নেতা হয়েছেন।
ছাত্রলীগের সাবেক অনেক নেতাই বর্তমানে কোনো পদে নেই যেমন নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারের সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবু ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হলেও বর্তমানে কোনো পদে নেই। এছাড়া লিয়াকত আলী শিকদার, রিপন, রোটন, বদিউজ্জামান সোহাগ, সিদ্দিকী নাজমুল আলমের মত অনেক সাবেকরা তো রয়েছেনই। এছাড়া নানা সময়ে পদ থেকে ছিটকে পড়েছেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অনেক কেন্দ্রীয় পর্যাযের নেতারাও।
তাই আগামী ১০ ও ১১ জুলাই ২০তম জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দলের বর্তমান বা সাবেক, পদপ্রাপ্ত বা পদহীন, সাবেক নেতা কিন্তু বর্তমানে কোনো পদে নেই, সাবেক ছাত্রলীগ বা যুবলীগ নেতা-কর্মী সকলকেই কাজে লাগাতে চাচ্ছে।
আর দলকে শক্তিশালী করার জন্য এবং নেতা-কর্মীদের মাঝে তৈরী হওয়া ক্ষোভ দূর করার জন্য হাইব্রিড নেতাদের বাদ দিয়ে দলের প্রকৃত ত্যাগী নেতৃবৃন্দকে কাজে লাগাবে বলে নেতাকর্মীদের আশা দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।যাতে দলেও ক্রান্তিকালে দল হালছাড়া না হয়ে পড়ে।
দলের সম্মেলন উপলক্ষে ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হওয়া দলের গঠনতন্ত্র উপ-পরিষদের বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পদক ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, আমরা দলের গঠনতন্ত্র সংশোধনের কাজ করছি। গঠনতন্ত্রে দলের উপদেষ্টা পরিষদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদের সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হবে। আগামী ২০ জুনের মধ্যে একটি খসড়া গঠনতন্ত্র জমা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এ সম্পর্কে গত দপ্তর উপ-পরিষদের বৈঠকে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেছেন, যারা অতীতে ছাত্রলীগ বা যুবলীগের নেতা ছিলেন কিন্তু বর্তমানে ওএসডি (অফিসার অন স্পেসাল ডিউটি) রয়েছেন আমরা সবাইকেই কাজে লাগাবো।তাই এক ব্যক্তি একটির বেশি সর্বোচ্চ দুটি পরিষদের সদস্য হতে পারবে না।
এছাড়া দলের কিছু বিতর্কিত পদের সংশোধন করা হবে বলেও জানান ওবায়দুল কাদের। উপ-কমিটির সহ-সম্পাদকের বিষয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, পার্টি অফিসের সামনে কারো সাথে ধাক্কা লাগলেই সে পরিচয় দেয় আমি আওয়ামী লীগের সহ-সস্পাদক। কিন্তু সে যে উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক এ কথা বলে না। এই পরিচয়ের নাম ভাংগিয়ে অনেক সময় তার নিজ গ্রামে অনেককে হুমকি ধামকিও দেও। তাই এই পদ সংখ্যায় একশো’র বেশি দেয়া হবে না।বর্তমানে উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মোট ৪৬৭ জন।
উল্লেখ্য, আগামী ১০ ও ১১ জুলাই আওয়ামী লীগের ২০ তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।১৯৫৫ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারি সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি কেটে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর নাম করণ হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে মোট ১৯টি জাতীয় সম্মেলন করেছে দলটি। এবারের সম্মেলন ২০তম।
ইআর / এআই





