গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনে সৃষ্ট সংকট সমাধানে বাংলাদেশের নিবন্ধিত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে রাষ্ট্রপতির সংলাপকে বাহ্যিকভাবে ইতিবাচক বললেও এই সংলাপের সফলতা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি।
দলটির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের সংলাপ সফল হবে কিনা এ ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদি না হলেও কৌশলগত বিবেচনায় এতে অংশ নিয়েছে দলটি। অবশ্য সংশয় নিয়েও কেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি রোববার [১৮ ডিসেম্বর] রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদের সঙ্গে বঙ্গভবনে সংলাপে অংশ নিলেন-এমন প্রশ্নে দলটির শীর্ষ নেতাদের কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগের মধ্যে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক সহনশীলতা নেই। তারা পুরোপুরি ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের ভূমিকায় আছে। বিএনপির দাবির আলোকে সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন কখনোই হবে এমনটি মনে হচ্ছে না। সংসদ নির্বাচন পরিচালনার মূল আইন বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের জন্য যে প্রস্তাব বিএনপি দিয়েছে তার বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ আওয়ামী লীগ নেবে এমন কোন লক্ষণ নেই।
তাহলে কেন সংলাপে অংশ নেয়া-এমন প্রশ্নের জবাবে ওই নেতা বলেন, রাষ্ট্রপতির আহবানে এখন সংলাপে অংশ না নেয়া মানে হলো আবারো আওয়ামী লীগকে ফাঁকা মাঠে গোল করার সুযোগ করে দেয়া। পরবর্তীতে একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এলে বিএনপির হয়তো কিছু বলার থাকবে না। তাই আপাতত এই সংলাপে অংশ নেয়া ছাড়া বিএনপির সামনে কোন পথ খোলা নেই।
গত রোববার বিএনপির ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপে অংশ নেন। বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বঙ্গভবনে পৌঁছায় বিএনপির প্রতিনিধি দল। এক ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক শেষে ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা বঙ্গভবন ত্যাগ করেন।
পরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাবে যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তা হচ্ছে সকল রাজনৈতিক দলের মতৈক্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন করা।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা মূলত তিনটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করেছি। বাছাই কমিটি গঠন, নির্বাচন কমিশন গঠন এবং আরপিও সংশোধন ও নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ।’
এদিকে, আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং কমপক্ষে আরো চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের যে ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেয়া আছে সে সুযোগ কখনো হাতছাড়া করবে না ক্ষমতাসীনরা। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়ে রাষ্ট্রপতি যাদেরকে ভালো মনে করবেন তাদের দিয়েই নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ কেবলই রাজনৈতিক কারণে।
সংলাপের নামে কেন এই ‘আই ওয়াশ’-জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা বলেন, রাজনীতি এক ধরনের খেলা – এটা সবাই জানেন। এখানে নানা কৌশল করতে হয়। দেশের জনগণের সেন্টিমেন্ট নিজেদের পক্ষে রাখতে অনেক কিছুরই উদ্যোগ নিতে হয়। তাছাড়া সংবিধানের বাইরে তো আমরা যাচ্ছি না।
বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দিন আহমদের মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুসারে এই নির্বাচন কমিশন গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। তবে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’ অর্থাৎ বর্তমান সিস্টেমে নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শই মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।
এদিকে রোববার বঙ্গবভনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বিষয়টিকে আশাবাদী বলে বক্তব্য দিচ্ছেন, তখনই আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলির সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে গঠিত সার্চ কমিটির বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার জন্য বিএনপির প্রতি আহবান জানান।
নাসিম বলেন, বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আপনারা আপনাদের পরামর্শ দিয়ে এসেছেন, ভাল কথা। রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠনে যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল মেনে নেবে। আশা করি, আপনারাও মেনে নেবেন। এ নিয়ে কোনো ধরনের ঝামেলা করবেন না।
অপরদিকে, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি যদি মনে করে- ‘সালিশ মানি কিন্তু তালগাছটা আমার’, তাহলে সংলাপ সফল হবে না
আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী ফোরামের দুই শীর্ষ নেতার এমন বক্তব্যের বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাৎক্ষণিক কোন প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। তবে, বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করেন, এভাবে সংলাপ করে একদিকে আওয়ামী লীগ দেশবাসীকে দেখাতে চায় তারা সবার সাথে আলাপ-আলোচনা করে তারা শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন ও আগামী সংসদ নির্বাচন করতে চায়। আর প্রকৃত পক্ষে তারা তাদের পছন্দ মতো লোককে দিয়েই নির্বাচন কমিশন গঠন করে আবারো একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসতে চায়।
বিএনপির হাই-কমান্ড অবশ্য এখনি এ বিষয়ে এভাবে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে চায় না। তাদের মতে, তা করা হলে এটাকে নেতিবাচকভাবে প্রচার করা হতে পারে। রাষ্ট্রপতি মাত্র সংলাপ শুরু করেছেন এবং শুধুমাত্র বিএনপির সাথেই এ পর্যন্ত সংলাপ করেছেন। বাকি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথেও সংলাপের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপে কী প্রস্তাব দেয়, তারপর সরকার কী করে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বাকিরা কী বলেন- এসব কিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেই বিএনপি যথাসময়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে বলে দলীয় সূত্র উল্লেখ করে।
বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক নিবন্ধন এরই মধ্যে বাতিল হওয়ায় দলটিকে সংলাপের বাইরে রাখা হয়েছে। এ ব্যাপারে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোন প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। ঢাকা মহানগর জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা জানান, ‘জামায়াতকে মাইনাস করার যে চক্রান্ত বর্তমান সরকার করছে তাতে বিএনপি পা দিলে বিএনপিকেও একই চক্রান্তের মুখোমুখি হতে হবে।’
এদিকে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়ে সংলাপের জন্য ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নামের তালিকা জমা দিয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি। রোববার [১৮ডিসেম্বর] দুপুরে দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে এই তালিকা জমা দেন। ২১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে বসার কথা রয়েছে কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমেদ বীরবিক্রমের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির নেতাদের।
ইসি গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের জন্য প্রথম দফায় রাষ্ট্রপতি বিএনপি, জাতীয় পার্টি, এলডিপি, জাসদ, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আর তারই ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে বিএনপির সঙ্গে সংলাপ সম্পন্ন হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০ ডিসেম্বর বিকাল ৩টায় জাতীয় পার্টি, ২১ ডিসেম্বর বিকাল ৩টায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও সাড়ে ৪টায় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং ২২ ডিসেম্বর বিকাল তিনটায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সঙ্গে সংলাপে বসার কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতির।(source-southasianmonitor)
এমবি





