নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলনের দুই মাস পার অতিবাহিত হল। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালনকে কেন্দ্র করে যে অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয় তা বিরতিহীনভাবে চলে ৬০ দিন। পরবর্তীতে এরইমধ্যে যোগ হয়েছে কয়েক দফা ৭২ ঘন্টার হরতাল। যার সঙ্গে আরও যোগ হয়েছে ৪৮ ঘন্টা।

রাজনীতিতে দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজপথে বিরোধী দলের টানা আন্দোলন কর্মসূচি এর চেয়ে দীর্ঘ সময় আর হয়নি। ক্ষমতাসীনরা অস্বীকার করলেও টানা আন্দোলনে দেশের অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবন যাত্রা যে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখেনা। চলমান আন্দোলন কর্মসূচি ঘিরে প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে সবাইকে। এখানে নাশকতাকারীদের ছোড়া পেট্রল বোমায় যেমন প্রতিদিনই মানুষ দগ্ধ হচ্ছে তেমনি আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে বিনা বিচারে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় বেশিরভাগ সাধারণ মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে।

গতকাল (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত টানা ২ মাসের চলমান আন্দোলনে ১১৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে পেট্রল বোমায় আগুনে দগ্ধ হয়ে ৬২ জন, কথিত বন্দুকযুদ্ধে ও ক্রসফায়ারে ৪২ জন এবং গনপিটুনি ও অন্যান্য ঘটনায় ১১ জন। সব কিছু মিলিয়ে রাজনীতির এই বর্তমান অস্বাভাবিক অবস্থা কতদিনে প্রশমিত হবে এমন প্রশ্ন দেশের শান্তিকামী ও গণতন্ত্র প্রিয় মানুষের।

অন্যদিকে টানা অবরোধ আর হরতালে বিরোধী জোটের অর্জনই বা কতটুকু। সে বিষয়টিও এখন আলোচনা হচ্ছে সর্বত্র। বিরোধী জোটের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে। তাদের মতে ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সেটি এরইমধ্যে প্রমাণিত। না হলে ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এত দীর্ঘ সময় আন্দোলন অব্যাহত রাখা সম্ভব হত না। নেতারা আরও মনে করেন সরকারের কঠোর দমননীতির কারণে সাধারণ জনগণ রাজপথের আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও তারা ২০ দলীয় জোটের দাবির পক্ষেই আছেন।

তাদের আরও দাবি বর্তমান আন্দোলনে কেবল দেশের জনগণই নয় গণতন্ত্রের পক্ষে আন্তর্জাতিক সব শক্তিই সমর্থন করছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের উদ্ধেগ প্রকাশ করে বক্তব্য, ইইউ মানবাধিকার প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে সফর ও সবশেষ বাংলাদেশের চলমান সংকট নিরসনে উদ্যোগ নিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে ১১ কংগ্রেসম্যানের চিঠি দেয়া এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতিকেও গণতন্ত্রের লড়াইয়ে সমর্থন হিসেবেই দেখছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দৃশ্যত সরকার বিরোধী জোটের দাবি মেনে না নিয়ে সংলাপে আগ্রহ না দেখালেও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে আছে তাও বলা যাবে না। সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর বক্তব্যে এর সত্যতা মিলে। সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বর্তমান অবস্থাকে জাতীয় সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আন্দোলনের বিষয়ে মুখে সরকারের লোকজন যতই তাচ্ছিল্য করুক না কেন কর্মসূচি অব্যাহত থাকায় তাদেরকেও বেশ ভাবিয়ে তুলছে। আন্দোলন বন্ধের কোনো কৌশলেই যে কাজে আসছে না সেটিও বুঝতে পারছেন।

চলমান আন্দোলনে বিরোধী জোটের অর্জন বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান টাইম নিউজ বিডিকে বলেন, বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট জনগণের অধিকার আদায় ও গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার জন্য আন্দোলন করছে। এই আন্দোলনে দেশের জনগণ আমাদের সঙ্গে রয়েছে। কারণ জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো আন্দোলন এত দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যেত না। জনগণকে সম্পৃক্ত করাই আমাদের অর্জন।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির আন্দোলন যে যৌক্তিক সেটা কেবল দেশের জনগণ নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বের শক্তিগুলোর বক্তব্যেও বুঝা যাচ্ছে। তারাও মনে করছে বাংলাদেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে অনুপস্থিত। তাই চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে তারা বারবার সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছে।

বিএনপি চেয়ারপরসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন টাইম নিউজ বিডিকে বলেন, বিএনপি সরকার পতনের আন্দোলন করছে না। বিএনপিসহ দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে। সেই নির্বাচন দেশ-বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তাই সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে। সেই আন্দোলনে দেশের সাধারণ মানুষসহ সবারই সমর্থন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজও মনে করছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র ফিরে আসবে না।

এমএইচ/কেএইচ