স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে শরিকদের সাথে পরামর্শ না করা,

কোনো নির্দেশনা ছাড়াই এককভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা, শরিকদের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার না দেয়া ও ইচ্ছেমতো ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাসহ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে ক্ষোভের অনলে পুড়ছে শরিকদলগুলো।

সর্বশেষ চলতি মাসে অনুষ্ঠিতব্য জেলা পরিষদ নির্বাচন ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটের প্রার্থিতা দেয়ার ক্ষেত্রেও শরিকদের সাথে কোনো আলোচনা না করেই আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ,

প্রার্থী চূড়ান্তকরণ ও নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও আজ অবধি জোট প্রধান আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় শরিক দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষে নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে ক্ষমতাসীন জোটের একাধিক নেতার সাথে আলাপকালে জানা গেছে।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটের অন্যতম শরিক জাসদের একজন মেয়র প্রার্থী থাকলেও বৈঠক ডেকে কৌশলে ওই প্রার্থীকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করাতে সক্ষম হয় আওয়ামী লীগ।
সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অংশ না নিলেও ক্ষমতাসীন জোটের শরিক দলগুলো একাট্টা হয়ে সমর্থন দেয় আওয়ামী লীগকে।

ওই নির্বাচনে জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি কয়েকটি এমপি পদ পায় এবং সরকার গঠনের পর মন্ত্রী পরিষদে ভাগ বসায় জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি। এরপরেই উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হলেও কোনো পাত্তা পায়নি ক্ষমতাসীন জোটের শরিক দলগুলো।

নির্বাচনে মেয়র, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে শক্ত প্রার্থী থাকলেও কোনো ছাড় না দিয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। এতে আওয়ামী লীগ ইতিবাচক ফল ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হলেও বিপর্যয় ঘটে শরিক দগুলোর প্রার্থীদের ক্ষেত্রে।

এ মাসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত জেলা পরিষদ নির্বাচন। এর আগেরবার শরিক দলগুলো জোট প্রধান আওয়ামী লীগের কাছে সমন্বয় করে জেলা পরিষদ প্রশাসক নিয়োগের দাবি জানালেও তাতে সাড়া পায়নি। এবারো কোনো আলোচনা না করেই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে এককভাবে লড়ছে আওয়ামী লীগ।

জোটের একাধিক নেতা আলাপকালে জানান, জেলা পরিষদ নির্বাচনে শরিকদের কৌশলে আটকে দেয়া হয়েছে। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে একজন প্রার্থীকে ফরম উঠানো থেকে শুরু করে জমা দেয়া পর্যন্ত লক্ষাধিক টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

ফরম কেনা, তার সাথে একটি নির্বাচনী সিডি কেনাসহ অন্যান্য খাতে এই ব্যয় ধরা হয়েছে। যেহেতু শরিক দলগুলোর আয় কম, ছোট ছোট দল, ফলে কোনোভাবেই এত টাকা খরচ করে চেয়ারম্যান পদে লড়তে যাওয়া সম্ভব হবে না।

আর নির্বাচন কমিশন যা করছে তা একটি ভুতুড়ে কাজ কারবার ছাড়া আর কিছুই নয়। নতুন নতুন আইন করে সব বিষয়ই জটিল করে ফেলছে।

তবে নিয়মনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে জোট প্রধান আওয়ামী লীগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তাদের মতো করে নির্বাচনী আইন তৈরি করতে সহায়ক হলে ছোট ছোট দলগুলো নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়বে এটাই স্বাভাবিক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলা পরিষদ নির্বাচনে জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টির তিন-চারজন, বাসদের নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ, গণতন্ত্রী পার্টির কিশোরগঞ্জসহ বেশির ভাগ দলের চেয়ারম্যানসহ মেম্বার পদে একাধিক শক্ত প্রার্থী রয়েছে। কিন্তু জোটের সাথে সমন্বয় না থাকায় দলগুলো কোনো জেলায় চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না।

এ পদে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মধ্যে লড়াই হচ্ছে। চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা না দিলেও মেম্বার পদে বেশির ভাগ দলই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটের অন্যতম শরিক জাসদের একজন শক্ত প্রার্থী থাকলেও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ডা: সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে গত ৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক ডেকে জোটের সমর্থন আদায় করা হয়।

একইসঙ্গে জাসদকে দু’টি কাউন্সিলর প্রার্থী ছাড় দেয়ার কথা থাকলেও এখনো তা নিশ্চিত করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ন্যাপের সহসাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, শুধু জেলা পরিষদ বা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নয়, কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কোনো আলোচনা করে না।

আওয়ামী লীগ তাদের মতো করে নির্বাচনে প্রার্থী দেয়। তিনি বলেন, সব ধরনের নির্বাচন সুন্দর, সুষ্ঠু হোক এটা আমরা আশা করি। এখানে সরকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে নির্বাচনে যদি গণতন্ত্র না থাকে তাহলে এত উন্নয়ন দিয়ে কী হবে?

গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নূরুর রহমান সেলিম বলেন, কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে বা পরে আলোচনা করা হয় না। এ নির্বাচনে জোটগতভাবে আলোচনা হয়নি। ফলে চেয়ারম্যান পদে আমাদের কোনো প্রার্থী দেয়া হয়নি।

বাসদের আহ্বায়ক রেজাউর রশীদ খান বলেন, নিজেদের কয়েকজন প্রার্থী আছে, তাদের জেতানোর জন্য কাজ করছি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী জিতবে না হারবে, এটা তাদের বিষয়।

এ প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিক বলেন, এখানে জোটেরই কোনো ফাংশন নেই। সময় পেলে আমরা বসি। প্রেস ব্রিফিং করি। তিনি বলেন, আমাদের মতামত চাওয়ার একটা যে ব্যাপার আছে তাও আওয়ামী লীগ নেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না।

জাসদের (ইনু) দফতর সম্পাদক আব্দুল্লাহিল কাইয়ুম বলেন, জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমাদের মেয়র প্রার্থীর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, জেলা পরিষদ নির্বাচনে গাইবান্ধায় চেয়ারম্যান পদে আমাদের একজন প্রার্থী আছে। এখানে সিরিয়াসলি নির্বাচন হবে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ এমপি বলেন, জেলা পরিষদ নির্বাচন উন্মুক্ত, এটা প্রতীক নিয়ে কোনো নির্বাচন নয়, এটা নির্দলীয় নির্বাচন। এখানে সবারই প্রার্থী দেয়ার অধিকার আছে। এই নির্বাচনে শরিক দলগুলো কোনো প্রার্থী দেয়নি। ফলে এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের কিছুই নেই।

নাসিক নির্বাচনের প্রার্থী দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে জনপ্রিয় অন্যান্য দলের প্রার্থী কী আছে? সেখানে দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন হচ্ছে। একপক্ষে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে, অন্যপক্ষ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে।

ফলে জোটের শরিক দলগুলোকে এ বিষয়টি বুঝতে হবে। হাছান মাহমুদ বলেন, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ না থাকি তাহলে নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শরিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাব, বিষয়টি অনুধাবন করে নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।

মাহমুদ