আপিল বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহালের পর বুধবার ২৪ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে দলটি। মঙ্গলবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই হরতালের ডাক দেন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, সরকার জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য জামায়াত নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করে বিচারের নামে প্রহসনের আয়োজন করে। সরকারী ষড়যন্ত্রের শিকার আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তার আপোষহীন নেতৃত্বে দিশেহারা হয়ে সরকার তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তথাকথিত মানবতা বিরোধী অপরাধের মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করে।
ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদকে ১, ৬, এবং ৭ নং অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। মুজাহিদ এ রায়ের বিরুদ্ধে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টে আপীল করেন। মাননীয় আপীল বিভাগ মুজাহিদের আপীল খারিজ করে ৬ নং অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। এ রায়ে মুজাহিদ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দেশের জনগণ এ রায়ে হতাশ হয়েছে।
জামায়াত আমীর বলেন, সরকারের দায়ের করা মামলাটি সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত মুজাহিদের বিরুদ্ধে ফরিদপুর জেলাধীন কোন থানায় বা বাংলাদেশের অন্য কোন থানায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত কোন অপরাধের জন্য কোন মামলা হয়েছে, এমন কোন তথ্য তিনি তার তদন্তে পাননি।
মামলার আইও এটাও স্বীকার করেছেন যে, মুজাহিদ আল বদর, শান্তি কমিটি, রাজাকার বা আল শামস বা এই ধরনের কোন সহযোগী বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, এমন কোন তথ্য তিনি তার তদন্তকালে পাননি। এর পরও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে সরকারের সাজানো মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। তিনি জুলুমের শিকার হয়েছেন।
মকবুল আহমাদ বলেন, সরকারের দায়ের করা ৬ নং অভিযোগে মুজাহিদকে বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে জড়ানোর ষড়যন্ত্র করা হয়। সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাকে ফাঁসানোর জন্য বুদ্ধিজীবী হত্যার এই অপবাদ রচনা করে। তার বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগ পত্রের কোথাও একটি বারের জন্যও বলা হয়নি যে, মুজাহিদ কবে কিভাবে কোন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা বা অপহরণ করেছেন। কোন অভিযোগেই সুনির্দিষ্ট দিন, তারিখ উল্লেখ নেই।
বুদ্ধিজীবী পরিবারের কোন সদস্য, যারা ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইন্সিটিটিউটের কথিত ঘটনার ভিক্টিম তাদের কারো স্ত্রী বা সন্তান-সন্ততি ট্রাইব্যুনালে এসে মুজাহিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেননি। অথচ সরকার মুজাহিদকে ফাঁসানোর জন্য যে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছে তার ভিত্তিতে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। মুজাহিদ এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ দায়ের করবেন। রিভিউ আবেদনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে মুজাহিদ খালাস পাবেন বলে আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি।
তিনি বলেন, দেশবাসী অবগত আছেন ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। স্বাধীনতা উত্তর আওয়ামী সরকারের আমলে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণসহ জহির রায়হানকে অপহরণ করা হয়। তার রহস্য আওয়ামী সরকার উন্মোচন করেনি। অত্যন্ত সুকৌশলে তদানীন্তন আওয়ামী সরকার বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডটি এড়িয়ে গিয়েছে। সেই বুদ্ধিজীবী হত্যার মিথ্যা অভিযোগ মুজাহিদের ঘাড়ে চাপিয়ে সরকার তার অতীতের কূটকৌশল বাস্তবায়ন করলো মাত্র। ভবিষ্যত প্রজন্ম ও সত্যানুসন্ধিৎসু ইতিহাস গবেষকদের নিকট
বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল রহস্য অবশ্যই উন্মোচিত হবে ইনশাআল্লাহ্।
বিবৃতি জামায়াত নেতা বলেন, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে হত্যার সরকারী ষড়ন্ত্রের প্রতিবাদে, তিনিসহ আটক জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও নেতাকর্মীর মুক্তির দাবীতে ১৭ জুন বুধবার সকাল ৬টা থেকে ১৮ জুন বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচী ঘোষণা করছি। ঘোষিত এ কর্মসূচী শান্তিপূর্ণভাবে সফল করার জন্য দেশের বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, আইনবিদ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষসহ সর্বস্তরের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি। তবে হাসপাতাল, এম্বুলেন্স, ফার্মেসী ইত্যাদি হরতালের আওতামুক্ত থাকবে।
উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছে সু্প্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আপিল আবেদন খারিজ করে দিয়ে ফাঁসির আদেশ বহাল রেখে মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করেন।
সাবেক এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলোর মধ্যে ৩, ৫ ও ৬ নম্বর অভিযোগে ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন। এছাড়াও ৪ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং ৭ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেন আদালত।
২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর আপিল বিভাগে এ নিয়ে চারটি মামলার নিষ্পত্তি হলো। এর মধ্যে তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
পরে একই বছরের ১১ আগস্ট ট্রাইব্যুনালের ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তবে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় আপিল করেননি রাষ্ট্রপক্ষ।
এআর





