মেয়াদ শেষ হওয়ার দীর্ঘ ৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিভক্ত রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণের নগর পিতা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ভোটযুদ্ধ নেমেছেন মেয়র পদের প্রার্থীরা। ভোটাররাও পছন্দের প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। তবে দক্ষিণে ভোটযুদ্ধে মাঠে না থেকেও সাধারণ ভোটারদের আলোচনায় আছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই হেভিওয়েট নেতা। একজন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা অন্যজন আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্বতন্ত্র এমপি হাজী সেলিম।
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দল সমর্থিত প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে এই দুজনের নেপথ্য ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কেননা ঢাকা সিটির দক্ষিণে সাধারণ ভোটারদের ওপর এই দুই নেতার ব্যক্তিগত প্রভাব রয়েছে।
যদিও হাজী সেলিম নিজে দক্ষিণে মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়েছিলেন। কিন্তু দলের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন জমা দিতে পারেননি। অন্যদিকে খোকা নিজে নির্বাচনের ইচ্ছে প্রকাশ না করলেও তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আব্দুস সালাম প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। সেখানে দলীয় সমর্থন পেয়েছেন মহানগরের বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন থেকে খোকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস।
সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণে বিশেষত লালবাগসহ পুরানো ঢাকায় হাজী সেলিমের ব্যক্তিগত ভালো প্রভাব রয়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-০৭ আসনে (লালবাগ) আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনকে ব্যক্তিগত ইমেজ দিয়ে পরাজিত করেন। বিরোধী জোটের বর্জনে একতরফা ওই নির্বাচনে হাজী সেলিম পেয়েছিলেন ৪২ হাজার ৭২৮ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী পান ৩০ হাজার ৭৩৩ ভোট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, নিজে প্রার্থী হতে না পেরে হাজী সেলিম এখনো হতাশ। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকনের জন্য কতটুকু কাজ করছেন তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। অবশ্য দলীয় ফোরামে হাজী সেলিম আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকনের পক্ষে কাজ করার সম্মতি দিয়েছেন। যদিও এ মাসের (এপ্রিল) শুরুতে এক শুক্রবারে দুজনে একসঙ্গে জুমার নামাজ পড়েছেন খাবারও খেয়েছেন। তবে এরপর থেকে হাজী সেলিম সেভাবে আর মাঠে নেই। তিনি অনেকটা চুপচাপ আছেন। তাঁর অনুসারীদের অনেকে মাঠে আছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাজী সেলিম কী করেন তা দেখার বিষয়। আর বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন কবে দেশে আসবেন তাও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না।
তবে তার ঘনিষ্ট লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশে অপারগতা জানিয়ে বলেন, হাজী সেলিম দক্ষিণে মেয়র পদে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। এলাকার জনগণও তাকে মেয়র হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। তবে দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেননি।
তবে তার অনুসারীরা সাঈদ খোকনের জন্য মাঠে সক্রিয় আছেন কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের ওই নেতা বলেন, উনি (সাঈদ খোকন) আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী। কিন্তু এখন পর্যন্ত দলের সব নেতাকর্মীকে কাজে লাগাতে পারেননি।
অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগরের সাবেক আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা এবং বর্তমান আহ্বায়ক মির্জা আব্বাসের দ্বন্দ্ব বেশ পুরোনো। ২০১৩ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকার বিরোধী আন্দোলনে ঢাকায় ব্যর্থতার জন্য মির্জা আব্বাস ও তাঁর অনুসারীরা সরাসরি তখন খোকাকে দায়ী করেছিলেন। পরে খোকার নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে আব্বাসকে আহ্বায়ক করা হয়।
খোকার সমর্থকদের অভিযোগ, আব্বাস তখন থেকে মহানগরে নিজের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার পর কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া নিয়ে খোকার অনুসারীরা ক্ষুব্ধ। তাঁদের অভিযোগ, মির্জা আব্বাসের অনুসারীদের নির্বাচনে সুযোগ করে দিতে গিয়ে কাউন্সিলর পদে 'অযোগ্যদের' বিএনপির সমর্থন দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, দুই সিটির ৯৩টি কাউন্সিলর আসনের মধ্যে এবার খোকার অনুসারীরা ২৮টিতে দলীয় সমর্থন পেয়েছেন। বাকিগুলোতে মির্জা আব্বাসের পছন্দের লোকদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় খোকার প্রভাব কমাতে এমনটা করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ বিএনপির ঢাকা মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। দলের আহ্বায়ক থাকার পাশাপাশি ছিলেন অবিভক্ত ঢাকার মেয়র। ঢাকার ওয়ার্ডগুলোতে এর আগে বেশিরভাগই বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর ছিলেন। তারা প্রায় সবাই খোকার অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও দলীয় ওয়ার্ড কমিটিগুলোতেও খোকার একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় ছিল। সে কারণে খোকার একটি ভালো প্রভাব রয়েছে দক্ষিণে। কিন্তু তিনি লম্বা সময় ধরে দেশের বাইরে আছেন। তবে বাইরে থেকেও তিনি দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন। এ অবস্থায় খোকার সমর্থকেরা শেষ পর্যন্ত মির্জা আব্বাসের জন্য কতটুকু কাজ করবেন তা এখন প্রশ্ন সাপেক্ষ।
এবিষয়ে খোকার অনুসারী হিসেবে পরিচিত সাবেক একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইম নিউজ বিডিকে বলেন, মির্জা আব্বাস দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, মহানগরীর আহ্বায়ক ও বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণের ২০ দলীয় জোটের সমর্থিত মেয়র প্রার্থী।
দেশের রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত পছন্দের অপছন্দের সুযোগ নেই। তাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সবাই তার পক্ষে মাঠে নামবেন এটিই আমার বিশ্বাস।
কিন্তু দলের নেতাকর্মীদের মাঠে নামানোর জন্য উনাকে (মির্জা আব্বাস) কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন দলের অনেকেই মামলায় খড়গ নিয়ে আত্মগোপনে আছেন। তাদের জামিনের ব্যবস্থা করতে হবে।
এমএইচ/এএইচ





