বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল (মঙ্গলবার) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণা করবে। এমনই পটভূমিতে টাইমনিউজবিডির পাঠকদের জন্য মাওলানা নিজামী সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলো:

জন্ম:
১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী পাবনা জেলার সাথিয়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম লুৎফর রহমান খান। তিনি এলাকায় একজন অত্যন্ত ধার্মিক লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

শিক্ষা ও গবেষণা:
নিজ গ্রামের মনমথপুর প্রাইমারী স্কুলে নিজামীর লেখা-পড়ার সূচনা হয়। এরপর তিনি সাঁথিয়ার বোয়াইলমারী মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে তিনি দাখিল পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৯ সালে পাবনার শিবপুর ত্বহা সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে ১ম বিভাগে সমগ্র বোর্ডে ষোলতম স্থান অধিকার করে আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ সালে একই মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

১৯৬৩ সালে টাইটেল (কামিল) পরীক্ষায় মেধা তালিকায় প্রথম শ্রেণীতে ২য় স্থান লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্মাতক ডিগ্রী লাভ করেন তিনি।

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বিভিন্ন বিষয়ে ৫৪টি বই লিখেছেন। এর অধিকাংশই ইসলাম ধর্মের নানা দিক নিয়ে রচিত। তিনি বিশ্ব ইসলামিক স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার কর্তৃক ২০০৯ সালে প্রভাবশালী মুসলমানদের তালিকায় প্রথম ৫০ জনের মধ্যে ৪৩ তম স্থান লাভ করেন।

রাজনৈতিক জীবনঃ
মতিউর রহমান নিজামী ১৯৬১ সালে ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৬৬-৬৭, ৬৭-৬৮ এবং ১৯৬৮-৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন।

ছাত্রনেতা থাকাবস্থায় তিনি সক্রিয়ভাবে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৯৬৯ সালের ছাত্র অভ্যূত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নিজামী স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীতা করেছিলেন পাকিস্তানের সমর্থনে। দেশ স্বাধীন হবার পর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি অবশ্য আনুগত্য স্বীকার করে নিজমী স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থানের ব্যাপারে যেসব যুক্তি দেন তার মধ্যে অন্যতম হলো ভারতের সহায়তায় দেশ স্বাধীন হলে পরবর্তীতে দেশ ভারত করদরাজ্যে পরিণত হতে পারে।

ছাত্র জীবন সমাপ্ত করে নিজামী জামায়াত-ই-ইসলামীতে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি (জামায়াত-ই-ইসলামীর) দলের ঢাকা শহর শাখার আমির ছিলেন। ১৯৮৩-১৯৮৮ সালে তিনি জামায়াতের সহকারী সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৮ সালে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হন।

বাংলাদেশের স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী বিরোধী আন্দোলনে নিজামী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এছাড়া ১৯৯৪ সাল থেকেই বিএনপির বিরুদ্ধে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন নিজামী।

এ সময় আওয়ামী লীগ ও জামায়াত ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করে। কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওই আন্দোলনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তদানীন্তন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার পাশে বসে একাধিক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্যও রাখেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। এই আন্দোলনের ফলেই অবশেষে খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন।

রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ:
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী দুই মেয়াদে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। প্রথম মেয়াদে তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ৫ম জাতীয় সংসদে পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় দফায় ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তিনি একই আসন থেকে ৮ম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

দ্বিতীয় মেয়াদে সংসদ সদস্য হিসেবে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নিজামী পর্যায়ক্রমে দু’টি মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরমধ্যে ২০০১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত তিনি কৃষি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০৩ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তিনি শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

পরিবারঃ
নিজামী বিবাহিত এবং তার চার পুত্র ও দুই কন্যা আছে। তার স্ত্রীর নাম সামসুন্নাহার নিজামী।

মৃত্যুদন্ডের রায়ে নিজামীর প্রতিক্রিয়া:
চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম দায়রা জজ আদালত নিজামীকে অস্ত্র ও চোরাচালান মামলায় মৃত্যুদন্ড এবং যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়ে রায় দেয়। সেই রায়ের পর নিজামী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ““আমি মৃত্যুদন্ডে মোটেই ভীত নই। সন্ত্রস্ত নই। মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। আমাকে যদি মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়, তাহলে সেটা হবে শহীদি মৃত্যু। যেদিন ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়েছি, সেদিন থেকেই শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করি। ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তদানীন্তন ভাইস চ্যান্সেলরের দাওয়াতে আমন্ত্রিত হয়ে যখন আক্রান্ত হয়েছিলাম, তখনই আমি শহীদি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম। আমি বিশ্বাস করি, জীবন মৃত্যুর মালিক আল্লাহ্। আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো মৃত্যু হয় না। আল্লাহ যখন যেভাবে চান সেভাবেই আমার মৃত্যু হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কোন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমি প্রস্তুত”।