এক সময় বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামে অন্যতম ‘ভ্যানগার্ড’ হিসেবে পরিচিত সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের এখন বেহাল দশা। এক সময়ের সেই খ্যাতি যেন এখন ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে।
অতীতে ভ্যানগার্ড খ্যাত এই ছাত্রদলের ওপর যে কোনো আন্দোলন সংগ্রাম সফল করার দায়িত্ব দিয়ে স্বস্তিতে থাকত বিএনপি। কিন্তু সেই ছাত্রদলের বর্তমান এমন অবস্থা যেন বুড়ো নেতৃত্ব আর সমন্বয়হীনতার অভাবে, রাজপথে লড়াই করার মত সাহস, শক্তি কোনোটাই অবশিষ্ট নেই।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1396786039.jpg[/img]
১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আন্দোলন যখন সারাদেশ অচল তখনও ছাত্রদলের নিষ্ক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মত।
ছাত্রদলের এই নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ দলটির হাইকমান্ড। সম্প্রতি সংগঠনের নেতাদেরকে ডেকে হাইকমান্ডের এই মনোভাবের কথা জানিয়েও দেয়া হয়েছে ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৯২ সদস্যের ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিংহভাগের নিয়মিত ছাত্রত্ব নেই। এদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে মিলে-মিশে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। ছাত্রদলের নেতৃত্ব আছেন, আবার নিজের স্ত্রী সন্তানদের ভরন-পোষণও করতে হয় তাদের। কয়েকজন ছাত্রনেতার সন্তান স্কুলেও পড়ে। সরকারী-বেসরকারী চাকরী করেন এমন কয়েকজন ছাত্রনেতা এখনও কেন্দ্রীয় সংসদের পদে অধিষ্ঠিত আছেন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1396786098.jpg[/img]
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে কমিটি গঠনের সময় ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন, জেলা ও মহানগর কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেন, কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিনিয়র নেতাদের অপেক্ষাকৃত জুনিয়রদের নীচে পদ দেয়াকেও আন্দোলন সংগ্রামে চরম ব্যর্থ হওয়ার জন্য অনেকে দায়ী করছেন।
এছাড়াও নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল আর দলাদলি তো রয়েছেই। মাঠ পর্যায়ে কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত না হলেও গ্রুপিং জিইয়ে রাখতে এখনও পারদর্শী সংগঠনটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।
ছাত্রদল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রায় ৮ থেকে ১০ টি গ্রুপ-উপগ্রুপে ছাত্রদল বিভক্ত। এদের কেউ সভাপতি-সাধারন সম্পাদক গ্রুপে, আবার কেউবা অঞ্চলভিত্তিক গ্রুপের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকেই সাবেক নেতৃত্ব দেয়া বড় ভাইয়ের নামে পরিচালিত গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
যদিও ২০১২ সালে কমিটি ঘোষণার আগে তারা বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে ওয়াদা করেছিলেন যেকোন মূল্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন। নেতারা খালেদা জিয়াকে এমনও আশ্বাস দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার আন্দোলনের দাবানল ছড়াতে পারলে তা অতি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে কমিটি ঘোষণার পরে আর সে পথে হাটেননি সেই নেতারা।
কেন্দ্রীয় কমিটি বার বার বিবাদে আর অসাংগঠনিক হস্তক্ষেপ করে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাথে। ঢাবির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী না হওয়ায় শুরু থেকেই স্নায়ুযুদ্ধ চলতে থাকে। যার রেশ পরে বেশ কয়েকবার ঢাবির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও হল শাখাগুলোর কমিটি জমা দেয়ার পরও নানা অজুহাতে তা অনুমোদন করেনি কেন্দ্রীয় সংগঠনের নেতারা।
অন্যদিকে রাজপথের আন্দোলনের অনীহার কারনে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি। এমনকী গত ১লা জানুয়ারি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও কোনো রকম কর্মসূচি ছাড়াই দিনটি অতিবাহিত করতে হয়েছে। চোখে পড়ার মত কোনো কর্মসূচি ছিল না ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচিতেও।
সেদিন খালেদা জিয়াকে বাসভবনে আটকে রাখার পরেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি ছাত্রদল। জুনিয়র নেতাদের এমনও অভিযোগ রয়েছে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেই কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা তাদের মোবাইল বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান। এসময় তৃণমুল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের জন্য দেয়া হয়না কোন নির্দেশনাও।
এদিকে ২০১০ সালের জুনের পর থেকে ঢাবি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেনি ছাত্রদল। ফলে ছাত্রদলের অনেক কর্মী-সমর্থক থাকলেও তারা দিন দিন অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন। এতে করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। যার ফলশ্রুতিতে ঢাবি ক্যাম্পাসে বর্তমানে অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সংগঠনটির অবস্থা আরও শোচনীয়। নির্বাচনের পর বিএনপি চেয়ারপারসনের পক্ষ থেকে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সংগঠনকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে ছাত্রদল যেন কাগুজে বাঘে পরিণত হয়েছে। কারণ কারা আসবে নেতৃত্বে সেই হিসেব মিলাতে পারছে না পদ প্রত্যাশীরা।
পেশাজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন কমিটি দেয়া হবে এই সংবাদ জানার পর শিক্ষক ও সাংবাদিক নেতাদের কাছে লবিংয়ের জন্য ছুটে যান নেতৃত্ব পেতে। তবে শিক্ষক ও সাংবাদিক নেতারা ছাত্রদলের নেতাদের স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন দলের হাইকমান্ড। আমরা কেবল অবস্থান তুলে ধরার চেষ্ঠা করছি। কিন্তু যতই তদবির করা হোক না কেন, আন্দোলনে মাঠে ছিল না এমন কাউকে নেতা নির্বাচন করার কোনো সম্ভাবনা নেই।
সংগঠনটির এমন বেহাল দশার কারণ জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শামছুজ্জামান দুদু টাইম নিউজবিডিকে বলেন, ছাত্রদল ব্যর্থ হয়েছে সেটি আমি বলব না, কারণ গত কয়েক মাসে ফ্যাসিবাদ বিরোধী যে আন্দোলন হয়েছে সেখানে ছাত্রদলের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তারপরও তাদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই জেলে আটক থাকায় তাদের পক্ষে সেভাবে আন্দোলনটি পরিচালনা করা যায় নি।
ছাত্রদলকে গতিশীল করার জন্য তার মন্তব্য জানতে চাইলে দুদু আরও বলেন, ছাত্র রাজনীতিকে ছাত্র অঙ্গণে নিয়ে যেতে হবে এবং শিক্ষাঙ্গণকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সভাপতি সাধারণ সম্পাদক বর্তমানেও জেলে আছেন তাই নতুন কমিটি করতে চাইলে তাদের মতামত নেয়াটা দরকার।
সদ্য কারামুক্ত ছাত্রদলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুল করীম চৌধূরী আবেদ টাইম নিউজবিডিকে বলেন, সামগ্রিক আন্দোলন ব্যর্থ হলে ছাত্রদলও এর দায় নিতে অস্বীকার করবে না। ছাত্রদলের ওপর প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকায় এর চাপও অনেক বেশি ছিল সেটি আমি মেনে নিয়ে বলতে চাই- সারাদেশে যেখানে সরকার বিরোধী আন্দোলন সফল হয়েছে সেখানে ছাত্রদল অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে।
তবে ঢাকা মহানগরীতে আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৪টি ইউনিটকে শক্তিশালী না করতে পারাই বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলা যায়নি। ঢাবির পূর্ণাঙ্গ কমিটি না করতে পারা, সেই সঙ্গে হলগুলোর কমিটি করতে না পারাও ব্যর্থতার কারণ।
আবেদ আরও বলেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য হাই-কমান্ডের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। আগেরবার নেতৃত্ব নির্বাচনের সময় যারা ভূমিকা রেখেছিল সময় এসেছে তাদের মূল্যায়ন করার।
তিনি আরও বলেন, আমার মতে এই অবস্থায় প্রথমে একটি আহ্বায়ক কমিটি করে দিয়ে সারা দেশের সাংগঠনিক কমিটিগুলো পূণর্গঠন করা। তারপর বয়সের ফ্রেম নির্ধারণ করে দিয়ে কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠন করা।
[b]ঢাকা, এমএইচ, ৬ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি [/b]





