দুর্যোগপূর্ণ রাজনীতিতে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ৩বছরধরে সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের হাল ধরে রেখেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।সরকারের রোষানলে পড়ে ঠুনকো ও হাস্যকর মামলায় ইতোমধ্যে কয়েক দফায় গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন দলের ক্লিনম্যান খ্যাত এই নেতা। গেল দুই বছরের দীর্ঘ সময়ই তাকে কারাগারে থাকতে হয়েছে।দেশের ইতিহাসে ইতোপূর্বে বিরোধী দলের এই পর্যায়ের নেতার এভাবে জেলে যাওয়ার নজির নেই। অন্যদিকে সদালাপী ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের কারণে দলের তৃণমূল পর্যায়ে রয়েছে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা।দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশিষ্টজনসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছেও তার গ্রহণযোগ্যতার কমতি নেই।তবুও দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব তিনি।ভার মুক্ত হয় না তার। নেতা-কর্মীদের প্রশ্ন-আর কত মামলা হলে,জেল খাটলে মির্জা ফখরুল ভারমুক্ত হবেন? বিএনপির রাজনীতিতে আর কত পরীক্ষা তাকে দিতে হবে? আর যদি মির্জা ফখরুলকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নাই বা করা হয়, তাহলে অন্য কাউকে কেন ওই দায়িত্ব দেওয়া হয় না? এটা কী দলের অপূর্ণতা, না সাংগঠনিক দুর্বলতা সেই প্রশ্নও অনেকের। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের প্রধান বিরোধী দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নিয়োগ না দেওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে দলের দৈন্যতা হিসেবেই বিবেচনা করে থাকেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে,বিএনপির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশের বিরোধিতার কারণেই মির্জা ফখরুলকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করতে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন হাইকমান্ড । তবে অপর একটি সূত্রে জানা যায়,মির্জা ফখরুল ইসলামকে দলের পূর্ণ মহাসচিব করার ব্যাপারে বিএনপি হাইকমান্ড মানসিকভাবে প্রস্তুত হলেও নানা কারণে মির্জা ফখরুলের আরও যোগ্যতার পরীক্ষা নিতে চান।তাই তাঁকে ভারমুক্ত করার ব্যাপারে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করছেন দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা। তবে বিএনপির সিনিয়র অনেক নেতাই বলছেন,আগামী কাউন্সিল হলেই মির্জা ফখরুল ভারমুক্ত হতে পারেন।তবে তারা এও বলছেন, সহসাই দলের কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।কারণ তৃণমূলে দল গুছিয়ে তারপরেই জাতীয় কাউন্সিলের বিষয়টি নিয়ে ভাবা হবে। দলের চেয়ারপারসনের মনোভাব নাকি এমনটাই।তাহলে মির্জা ফখরুলকে এভাবে কতদিন এই ভার নিয়ে থাকতে হবে তাও অনিশ্চিত। জানা গেছে, ভারমুক্ত না থাকার কারণে অনেক সিদ্ধান্ত নিতেও তাকে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকতে হ।সর্বশেষ গত ১৬ মার্চ জেলে যাওয়ার পর বেগম জিয়া দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের কোনো বৈঠক ডাকেননি। তাছাড়া সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মহাসচিবের মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মির্জা ফখরুলের অনুসারি একজন নেতা বলেন, দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আগে কিছুটা দূরত্ব থাকলেও এখন আর সেই সমস্যা নেই। তারেক রহমানের পছন্দের মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলের পরিচিতিও রয়েছে।সেজন্য আগামী কাউন্সিল হলেই তিনি ভারমুক্ত হবেন এমনটা নিশ্চিত। বিগত ৩বছরে দায়িত্ব পালনের অনেক ক্ষেত্রেই সফলতার পরিচয় দেন মির্জা ফখরুল।অবশ্য আন্দোলন সংগ্রামের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনার মধ্যেও পড়তে হয়েছে তাকে। তারপরও সব ধকল কাটিয়ে এখনো তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।জেলা পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের দেখভাল করছেন তিনি।দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার কোনো গ্রুপিং-লবিং নেই। বিভাজনের সৃষ্টি করে কোনো পকেটের রাজনীতিতেও নেই তিনি। দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি কিংবা আর্থিক কোনো অনিয়মের অভিযোগও নেই তার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মির্জা ফখরুলের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য টাইম নিউজকে জানান,মির্জা ফখরুলের ভারপ্রাপ্ত আসলে শুধু নামেই।তিনি তো পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের মতোই দলে আছেন বলে আমি মনে করি।দলীয়ভাবেও সেই প্রটোকল মানা হচ্ছে। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও তিনি অংশ নিচ্ছেন।তবে কি কারণে তাকে এখনও পূর্নাঙ্গ মহাসচিব করা হচ্ছে না তা দলের চেয়ারপারসনই বলতে পারবেন। প্রসঙ্গত,২০১১ সালের ১৬ মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দলের তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন।এরপর ২০ মার্চ চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সৌদি আরবে যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে যান। এরই মধ্যে ২৭ মার্চ দেশে ফিরে আসেন খালেদা জিয়া।দেশে ফিরে ৬ এপ্রিল দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকেন।বৈঠক শেষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন,দলের গঠনতন্ত্রের পদ বিন্যাস অনুযায়ী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।সেই থেকে মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে বিকল্পধারা বাংলাদশের প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন-বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব (১৯৭৯-১৯৮৪)।এরপর কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান (১৯৮৪-১৯৮৬),কে এম ওবায়দুর রহমান (১৯৮৬-১৯৯১), ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার (১৯৯১-১৯৯৬),আবদুল মান্নান ভূঁইয়া (১৯৯৬-২০০৭)।২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাকে বহিষ্কার করা হলে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মহাসচিবের দায়িত্ব পান। তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা,এমএইচ,২মে (টাইমনিউজবিডি.কম)// জেএ





