বিএনপি-জামায়াতকে পাকিস্তানের দোসর ও এজেন্ট উল্লেখ করে তাদের বিষদাঁত একে একে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

আজ (সোমবার) বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমার অবাক লাগে, যখন কেউ ফোন করে মানবাধিকারের কথা বলে। আমি প্রশ্ন করি-কার মানবাধিকার? খুনিদের মানবাধিকার? তাহলে আমরা যারা ভিকটিম, আমাদের কি কোন অধিকার নেই? বিচার পাবার অধিকার নেই?”

প্রধানমন্ত্রী সমালোচনা করে বলেন, খুনিদের মানবাধিকার নিয়ে সবাই দু:শ্চিন্তাগ্রস্ত। শত বাধা অতিক্রম করে আজকে আমরা একে একে যুদ্ধাপরাধের রায় বাস্তবায়ন করতে পারছি। এজন্য আমি বাংলাদেশের জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই, আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। কারণ নিশ্চয়ই তিনি সব সময় ন্যায় বিচার করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি গর্ব ছিল- তারা সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী, তাদের সাথে যুদ্ধে কেউ পারে না। কিন্তু একাত্তরে আমাদের গেরিলা বাহিনীর কাছে তাদেরকে পরাজিত হতে হয়েছে।

একাত্তরের সেই পরাজয় পাকিস্তান এখনো ভুলেনি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, তাদের যারা (বিএনপি-জামায়াত) দোসর ও এজেন্ট তারা এখনো আমাদের দেশে রয়েছে। তারা এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করতে চায়, অর্থনৈতিক উন্নতি ধ্বংস করতে চায়।

শেখ হাসিনা বলেন, এই ষড়যন্ত্র ভেদ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমি বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশে এই ষড়যন্ত্র করে তারা আর বেশি কিছু করতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধের এই বিচারের মধ্য দিয়ে দেশ কলংকমুক্ত হবে। এ সময় তিনি জিয়াউর, রহমান, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে বলেন, ৭৫-এর পরে যারা ক্ষমতায় এসেছে প্রায় ২৯-৩০ বছর তারা ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের তারা কোন পরিবর্তন করতে পারেনি। তারা নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে। সত্যিকারের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে কেবল আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে।

বিএনপি-জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, যখনই মানুষের জীবনে শান্তি স্বস্তি ফিরে আসে তখনই কোন কোন মহলে অশান্তি শুরু হয়।

বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ৯২-৯৩ দিন ৬৮ জন মানুষ নিয়ে একটি অফিসে অবস্থান করে, অফিসের মধ্যে বসে থেকে হুকুম দিয়ে দিয়ে মানুষ পোড়ানো এবং এই কাজে অর্থ দেয়া, টাকা দেয়া ও পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে। ঠিক ৭১ সালে একইভাবে বস্তিতে আগুন দেয়া হয়েছিল। মানুষ যখনই বের হয়ে এসেছে, হানাদার বাহিনী গুলি করেছে। লাশ পড়ে থাকতো। আমার নিজের চোখে দেখেছি রাস্তায় রাস্তায় লাশ পড়ে থাকতে।

শেখ হাসিনা বলেন, ৭৫-এর পর ২১টি বছর এমন একটি পরিবেশ বাংলাদেশে সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, দেশের স্বাধীনতা আনাটাই বিরাট একটি অপরাধ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ করাও যেন বিরাট অপরাধ।

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতি রাতে জিয়া একশো-দেড়শো মানুষকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করতো।

সেনা বাহিনীর অফিসার, সৈনিক এবং বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা জিয়ার খুনের শিকার হয়েছিলেন দাবি করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তখন সেনাবাহিনীতে উনিশটি ক্যু হয়েছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষদের ধ্বংস করে দিচ্ছিলেন ৭১-এর পরাজিত বাহিনী। কারণ তারা পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছিলেন এবং এটা জিয়াউর রহমানের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। আর তার স্ত্রী (বেগম খালেদা জিয়া) এখনও ঠিক একই কাজ করে যাচ্ছেন।

খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের যে মন্ত্রী বানায় সে কোন মুখে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে যায়, সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করে, এটা মানুষের সাথে তামাশা ও মানুষকে ধোকা দেয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

খালেদা জিয়ার সাথে যেসব মুক্তিযোদ্ধা শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান তাদের লজ্জা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, “তাদের লজ্জা-শরম-ঘৃনা-পিত্তা থাকলে তারা তার (খালেদার) সাথে যেতে পারতেন না”।

শেখ হাসিনা বলেন, এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার আগে সঠিক ইতিহাসটি কেউ বলেনি। একটি বিকৃত ইতিহাস শেখানো হয়েছিল। একটা প্রজন্ম তো ভুলেই গিয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস।

প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়েছিল যে বঙ্গবন্ধুর নাম নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। “শুধু নিষিদ্ধই না, টেলিভিশনে যদি কোন প্রোগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ছবিটা যদি আসতো সঙ্গে সঙ্গে ওই জায়গা ঝিরঝির হয়ে যেত”।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার মনে আছে একটা বইয়ের ভেতরে অনেকগুলো ছবির মাঝখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি ছিল। ওই বইটি নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছে তখন ওই ছবিটির মাঝে একটি সাদা কাগজ দিয়ে আটকে দিয়ে তারপর দেখানো হচ্ছে। এই ছিল বাংলাদেশের অবস্থা। অনেকেই হয়তো তখন ভেবেছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাস করে তারা বুঝি আর কোনদিন ক্ষমতায় আসবে না”।

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, যেই শিক্ষার্থীদের হাতে আমরা বই দিয়েছি, খাতা-কলম দিয়েছি, তাদের হাতে খালেদা জিয়া দিয়েছে অস্ত্র। জিয়াউর রহমান এসে এটা শুরু করেছিল, এরশাদও সেটা অনুসরণ করেছে এবং খালেদা জিয়াও সেটা করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, “তাদের (ছাত্রদের) হাতে অস্ত্র, অর্থ, চকচকে মটরসাইকেল দিয়ে তাদের ব্যবহার করেছে।সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একই অবস্থার সৃষ্টি করেছিল।আমরা কোন ধরনের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছি না, দেব না”।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশকে আত্মনির্ভরশীল করতে কাজ করে। দেশকে ভিক্ষুকের জাতি বানানোর ষড়যন্ত্র রুখে দেয়। তিনি বলেন, “ধার করে ঘি খাওয়ার চেয়ে নিজের শক্তিতে নুন-ভাত খাওয়া অনেক মর্যাদার”।

সমালোচকদের প্রশ্নের জবাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আমরা একটার পর একটা অর্জন করছি আর অনেকে বলেন, এটা এর বেশি আর যাবে না, এটা ওর বেশি যাবে না, এটা হতে পারে না, ওটা হতে পারে না ইত্যাদি।

বেসরকারী টেলিভিশনের টকশোর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, টেলিভিশনকে বেসরকারি খাতে আমিই দিয়েছি। কাজেই অনেকে এখন অনেক কথা বলার সুযোগ পান। সারারাত ধরে টকশো চলে, সেখানে যে কত রকমের কথা হয় তার কোন হিসাব নেই।

শেখ হাসিনা বলেন, কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় হওয়ার পর নানা দিক থেকে চাপ এসেছিল। তিনি তাতে নিজ অবস্থান থেকে সরে যাননি। “একটা কথা মনে রাখতে হবে, কোন কাজ করতে গেলে, সিদ্ধান্ত একবার নিলে সে সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে”।

একাত্তরে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে তাদেরকে দেশের অভিশাপ হিসেবে আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, এই অভিশাপগুলো থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। “যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে, এক একটা বিচারের রায় কার্যকর হচ্ছে, বাংলাদেশ এক একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশ অভিশাপমুক্ত হচ্ছে”।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা কিছুদূর এগোই তারপর একটি বাধা, আবার কিছুদূর এগোই আবার একটি বাধা। ২০১৪ সালে নির্বাচন বন্ধ করার নামে শত শত মানুষকে হত্যা করা হলো, আহত করা হলো। গাড়ি-ঘোড়া পোড়ানো, স্কুল পোড়ানো, রিটার্নিং অফিসারকে ও সহ-প্রিজাইডিং অফিসারকে হত্যা করা, বিদ্যুৎকেন্দ্র পুড়িয়ে ফেলা, ইঞ্জিনিয়ারকে আগুনে ফেলে দিয়ে হত্যা করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করা, কি না করেছে বিএনপি-জামায়াত মিলে”।

তিনি আরো বলেন, তাদের সাথে যোগ হয়েছিল বিদেশী দোসর।আর আমাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে এমন কিছু লোকও নানা কথা বলেছিল। ঘরে-বাইরে নানা বাধা উপেক্ষা করেই সেই নির্বাচন করতে হয়েছিল। একবছর পর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে এসে আবারও শত শত মানুষকে পুড়িয়ে মারে বিএনপি-জামায়াত।

শেখ হাসিনা আরো অভিযোগ করেন, বিএনপি একসময় সংসদে পর্যন্ত বলেছিল, দেশ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ হওয়া ভালো না, তাহলে বিদেশী সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তাদের চিন্তা হলো-খাদ্য আমদানি করবে তাদের লোকেরা, তাদের কাছে তাদের ব্যবসাই বড়, দেশ নয়।

কেবি