বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যতটা ক্ষমতাশালী তার পক্ষে নির্বাচনের সময় চুপ করে বসে থাকা অসম্ভব। তাই নির্বাচন সুষ্ঠু করতে প্রধানমন্ত্রীকে সরে যেতে হবে।’
মঙ্গলবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর উত্তরায় নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঈদ পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।
ফখরুল বলেন, ‘ঈদের মধ্যে দু’একদিন রাজনীতি স্থিতিশীল ছিলো। ঈদের পর আবার কথাবার্তা হচ্ছে। কথাবার্তার মধ্যেই থাকতে হবে। দীর্ঘ অতীত অভিজ্ঞতায় আমরা বরাবর বলে এসেছি যে, আমরা (বিএনপি) নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার চাই। কারণ নির্বাচনের সময় যদি দলীয় সরকার থাকে তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ হয় না, হবে না।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই দাবিটা শুধু যে আমরাই করছি তা নয়। বরং বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের দাবি ছিলো নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার (তত্ত্বাবধায়ক) থাকতে হবে। যেহেতু দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একে অপরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব রয়েছে। পেশী শক্তিতে নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। শুধু তাই নয় নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল পালন করেছিলো। আমার প্রশ্ন-আওয়ামী লীগ এমন কি কাজ করেছে? আমাদেরকে (বিএনপি) ভালোবেসে যে-আওয়ামী লীগ ও এই সরকারের উপর আস্থা বিশ্বাস সৃষ্টি হয়ে গেছে; যে তাদের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, নির্বাচন করতে হবে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যতটা ক্ষমতাশালী তার পক্ষে নির্বাচনের সময় চুপ করে বসে থাকা এবং কোনও কিছু নিয়ন্ত্রণ না করা অসম্ভব ব্যাপার। সেজন্য বিএনপি মনে করে যদি নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হয় তাহলে তাকে (প্রধানমন্ত্রীকে) সরে যেতে হবে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার লাগবে। পাশাপাশি সংসদ ভাঙতে হবে এর কোনও বিকল্প নেই।’
তিনি বলেন, ‘১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটা বিএনপিকে করতে হয়েছিলো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায়। এবং আমরাই কিন্তু উদ্যোগ নিয়ে তখন নির্বাচনকালীন সরকার অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছি। সেই অনুযায়ী আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, সরকার গঠন করে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বও নিয়েছে। আর আমরা ১১৬ সংসদীয় আসন নিয়ে বিরোধীদলে গিয়েছি। পরবর্তীতে আরও নির্বাচন হয়েছে। কেউ কোনও কথা বলেননি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে। কিন্তু, দুর্ভাগ্য জনকভাবে ২০০৮ সালে বিশেষ করে ২০০৭ সালে মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন ২ বছর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে থাকে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই- তখন আওয়ামী লীগ বলেছিলো অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল বেআইনি। আর এখন বলছেন ‘১/১১ সরকার’ তাদের আন্দোলনের ফসল।’
আওয়ামী লীগ সব সময়েই বিএনপিকে খাটো করে দেখিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রাথমিক উপকরণ সব জায়গায় গণতন্ত্র চর্চা থাকতে হবে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। সেদিকে নজর না দিয়ে বরং তারা (আওয়ামী লীগ) সেই জায়গাটাকে ইচ্ছে করেই উপেক্ষা করে গেছে। মোট কথা ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার যাবতীয় ব্যবস্থা আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে। এজন্যই আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে বেশি দিন সময় নেয়নি। যার সাথে কখনও সর্ম্পক ছিল না, খায়রুল হকের একটি রায়ের পরে বলতে শুরু করেছে রায় হয়ে গেছে এখন আর তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সম্ভব নয়। অথচ সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের দেয়া রায়ে বলা হয়েছিলো- আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে যদি জনগণ চায়।’
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে তামাশার নির্বাচন আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণের মতমত তোয়াক্কা করে ১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করা হলো। ৫% ভোট পড়েনি। অনেক রক্তপাত হয়েছে। সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে ক্ষমতা আকড়ে ধরে রাখতে যাবতীয় কার্যক্রম সম্পূর্ণ করেছে। এরা সারাবিশ্বকে দেখাবে দেশে গণতন্ত্র আছে অথচ বাংলাদেশের মানুষ হারে হারে টের পাচ্ছে তাদের গণতন্ত্রের অবস্থা কোথায় আছে?’
আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হওয়াটা জরুরি দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘নিরপেক্ষ সরকারকে আমরা সহায়ক সরকার বলছি। যে সরকার নির্বাচনকালীন ৩ মাস কাজ করে পরবর্তীতে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেবে। কারণ সরকারের মেশিনারী যদি নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা না করে তাহলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন চালাতে পারবে না।’
নির্বাচন কমিশনের কঠোর সমালোচনা করে সাবেক এই ছাত্র নেতা বলেন, ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশন দলীয় লোক। সকল মতামতকে উপেক্ষা করে গঠন করা হয়েছে শুধুমাত্র নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। ইতোমধ্যে তারাও (নির্বাচন কমিশন) নেমে গেছে। কাজেই আমরা ইসি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করছি না বরং বিতর্ক সৃষ্টি করতেই এ ধরনের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে।’
যথাসময়ে বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে একটি রুপরেখা দেবে বলেও জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘আলোচনা হতে পারে, এর মাধ্যমেই সমাধান হবে। কিন্তু দুঃখজনক সেই পরিবেশ হচ্ছে না। বরং এমনভাবে কথা বলছেন যেন তারা আলোচনায় বসলে হেরে যাবেন।’
নিজ বাসভবনে প্রায় ৩০ মিনিটের বক্তব্যে ফখরুল বলেন, ‘জনগণের স্বার্থের কাছে কোনও কিছুই পরাজয়ের নয়। আমরা যা কিছু করছি সবকিছুই তো জনগণের জন্য। আমরা যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পাস করি তখন কী আমরা বলেছি যে আমরা হেরে গেছি। নো.. হারিনি।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমিই সব- এই দাম্ভিকতা পরিহার করতে হবে। আমিও সব চাপিয়ে দেব জনগণকে সেই ধারণা পরিবর্তন করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ কোনওদিন স্বৈরশাসন মেনে নেয়নি। হয়তো অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, অনেক সময় লেগেছে। কিন্তু গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে।’
জঙ্গি ইস্যুতে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জঙ্গি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। সমস্যা হচ্ছে সরকারকে আমরা বলছি যাকে ধরছেন তাকে না মেরে সঠিক সুনির্দিষ্ট তদন্ত করুন। খুঁজে বের করুণ কে বা কারা এই জঙ্গিবাদের পেছনে অর্থের যোগান দিচ্ছে, কারা আছে? তাদের পরিচয় জনগণের সামনে তুলে ধরুন। কিন্তু সরকার তা না শুনে যাকেই ধরছে তাকেই মেরে ফেলছে। আর এই মেরে ফেলাতে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। অনেক গল্প আছে। আমার কেন জানি মনে হয় তা জানি না-বাংলাদেশকে কী একটি জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর সহায়ক সরকারের মধ্যে পার্থক্য নেই মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিষয়টা হচ্ছে নিরপেক্ষ সরকার। যে নামেই ডাকা হউক না কেন। বিষয়টা তো এক। এ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। আলোচনাটা খুবেই জরুরি। গণতন্ত্রে যদি আলোচনা না থাকে তাহলে তো কিছু বলা যাবে না, করা যাবে না।’
বিএনপির আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কতদিন ঢাকাসহ সারাদেশ অচল ছিলো সেটা সকলেই অবগত। কাজেই বিএনপির আন্দোলন করার ক্ষমতা নাই এই নিয়ে বিতর্ক করতে চাই না। আমরা যে যেখানে সুযোগ পাচ্ছি সেখানে রাজনীতি করছি। হয় ঘরে নয়তো বাইরে রাজনীতি করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এখনেই সংঘাতে যেতে চাই না। আমরা সংঘাত এড়িয়ে যেতে চাই। সত্যিকার অর্থেই আগামী নির্বাচন একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশে হউক তা চাই। কখনও চাই না অতীতের পুনরাবৃত্তি হউক। বরং আমরা আশা করে আছি সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হউক। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেকে গণতন্ত্রের মানসকন্যা বলেন এবং দাবি করেন তার পিতা মরহুম শেখ মুজিব গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন।’
ফখরুল বলেন, ‘বহু হয়ে গেছে। বহু রক্ত ঝরেছে। নো বডি নো সেফ। কারও নিরাপত্তা নেই।’
রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। দুটো বিষয় আছে ৭১ সালে পাকিস্তান যখন আক্রমণ করেছে তখন ভারত আশ্রয় দিয়েছিলো। অথচ আজ মিয়ানমারের নিরীহ জনসাধারণ যে ধর্মের জাতির হউক তাদেরকে আমরা ঢুকতে দিচ্ছি না। বন্দুক হাতে পাহারা দিচ্ছি। সরকারের উচিত হবে মিয়ানমার সরকারকে বলা অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন বন্ধ করো। শুধু তাই নয় পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে জাতিসংঘের কাছে প্রস্তাব তুলে ধরবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি আগামী সপ্তাহের মধ্যে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরতে পারবেন।’





