জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের রিভিউ আবেদন খারিজ করে মৃত্যদণ্ড বহাল রাখার প্রতিবাদে দলটির ডাকে সারাদেশে চলছে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেয়াকে ষড়যন্ত্রমূলক সরকারী হত্যা হিসাবে আখ্যায়িত করে এর প্রতিবাদে হরতালের ডাক দেয় দলটি।
হরতালের সমর্থনে আজ (বৃহস্পতিবার) রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পিকেটিং ও সড়ক অবরোধ করেছেন জামায়াতের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।
যাত্রাবাড়ি (পূর্ব)
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ি মেডিকেল এলাকায় পিকেটিং ও সড়ক অবরোধ করেছেন জামায়াতে ইসলামী যাত্রাবাড়ি (পূর্ব) থানা। এসময় ৪টি গাড়ি ভাংচুর করেছে হরতাল সমর্থকরা।
পিকেটিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াত নেতা নিজাম উদ্দিন, রিয়াজুল হাসান, সাইফুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, হাবিবুর রহমান, মজিবুর রহমান প্রমূখ।
কদমতলী (পশ্চিম)
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শ্যামপুর ব্রিজ এলাকায় পিকেটিং ও সড়ক অবরোধ করেছে জামায়াতে ইসলামী কদমতলী (পশ্চিম) থানা।
থানা সেক্রেটারি এম আহমদেও নেতৃত্বে এতে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াত নেতা রহিমউদ্দিন, মহিউদ্দিন, এনামুল হক, সাব্বির হোসেন, আব্দুল ওয়াহাব, সাদিকুর রহমান প্রমূখ।
উল্লেখ্য, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় পুনঃবিবেচনার আবেদন গতকাল (বুধবার) খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চ এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় তাদের আবেদন খারিজ করেন। এতে এই দুই বিরোধী রাজনৈতিক নেতার বিচার প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপের পরিসমাপ্তি ঘটল।
এরফলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর (সাকা) দণ্ড কার্যকরে আর আইনি বাধা থাকল না।
নিয়মানুযায়ী তারা এখন নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন। এ বিষয়টি নিষ্পত্তি হলে সরকার দণ্ড কার্যকর করবে।
এর আগে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা ও মুহম্মদ কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ হয়েছিল। তারা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন না করায় কারা কর্তৃপক্ষ তাদের ফাঁসি কার্যকর করে।
বিএনপির শাসনামলে (২০০১-২০০৬) সাকা চৌধুরী মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা এবং মুজাহিদ সমাজকল্যাণমন্ত্রী ছিলেন।
রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, ‘দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দু’জনের রিভিউ আপিল বিভাগ কর্তৃক খারিজ হয়ে গেছে। তাদের ফাঁসি কার্যকরে আইনগত কোনো বাধা নেই।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ‘রিভিউ খারিজ সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় এখন ট্রাইব্যুনালে যাবে। সেখানে প্রক্রিয়া শেষে রায় যাবে কারাগারে। এরপর দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
এদিকে বুধবার রিভিউ খারিজ করে আপিল বিভাগের দেয়া রায় প্রকাশিত হয়নি। আজ (বৃহস্পতিবার) এই রায় প্রকাশের সম্ভাবনা আছে। রায় প্রকাশের পর সেটি ট্রাইব্যুনাল হয়ে যাবে কারা কর্তৃপক্ষের হাতে। রায়ের কপি হাতে পেয়ে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের ফাঁসি কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু করবে।
এরআগে বুধবার সকাল ৯টার দিকে সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি শুরু করেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ। বেলা ১১টার মধ্যে এই আবেদনের শুনানি গ্রহণ শেষ করেন আপিল বিভাগ। বেলা সাড়ে ১১টায় রায় ঘোষণার জন্য ধার্য করা হয়।
৩০ মিনিটের বিরতি থেকে ফিরে বেলা ১১টা ৩৩ মিনিটে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রিভিউ আবেদনই খারিজ করে আদেশ দেন আপিল বিভাগ।
এর আগে একই বেঞ্চ ১৭ নভেম্বর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ করেন। শুনানি গ্রহণ শেষে বুধবার রায় দেয়ার দিন ধার্য করেন।
আপিল বিভাগের বেঞ্চের অপর সদস্যরা হচ্ছেন- বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
সাকা চৌধুরীর রিভিউ খারিজের বিষয়ে খন্দকার মাহবুব সাংবাদিকদের বলেন, তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার ডিগ্রির সার্টিফিকেট আদালতে উপস্থাপন করেছি।
এ ব্যাপারে মাহবুবে আলম বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া যে ডুপ্লিকেট সার্টিফিকেট আদালতে দাখিল করেছেন সেটা ২০১২ সালে ইস্যু করা। আদালত তা গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।
মুজাহিদের রায় পুনর্বিবেচনার ব্যাপারে খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘আদালতে আমরা বলেছি, চার্জ-৬-এ যে দণ্ডটা দেয়া হয়েছে, সেটা ‘নট ইন অ্যাকোর্ডেন্স উইথ ল’। এখানে যে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে এই ধারায় তার সাজা হতে পারে না। বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে এর আগে ৪২টি মামলা হয়েছে, সেখানে মুজাহিদের নাম ছিল না। আলবদরের কোনো তালিকায় তার নাম পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত কর্মকর্তাও বলেছিলেন।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করছি এজন্য যে, তাকে শাস্তি দেয়া হল বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলায়। ১৯৭১ সালের ১৩-১৪-১৫ ডিসেম্বর যত সংখ্যক বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছে সেটা পৃথিবীর আর কোথাও করা হয়নি। এই বিচার যদি আমরা না পেতাম তাহলে অতৃপ্তি থেকে যেত। এ রায় আমাদের শক্তি, সান্ত্বনা।’
কেবি





