প্রবীণ রাজনীতিবিদ কাজী জাফর আহমদ ৬০ বছরের এক বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্রময় রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন। রাজনীতির শুরুটা তার ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে হলেও জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি বৃহস্পতিবার মৃত্যুবরণ করলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।
কাজী জাফর আহমদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে তিনি রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করেছিলেন। ১৯৫৫ সাল থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতি শুরু করেন। রাজশাহী জেলা ছাত্র ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক এবং রাজশাহী কলেজ সাহিত্য মজলিশের মুখপাত্র সাহিত্যিকের সম্পাদক হিসেবে তার কর্মময় রাজনীতির পদচারণা শুরু।
কাজী জাফর ১৯৩৯ সালের ১ জুলাই কুমিল্লার প্রখ্যাত চিওড়া কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি খুলনা জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হন। পরবর্তীকালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ও এমএ (ইতিহাস) পাস করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমএ এবং এলএলবি কোর্স সম্পন্ন করা স্বত্ত্বেও কারাগারে চলে যাওয়ায় পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে পারেননি।
কাজী জাফর আহমদ ১৯৫৯-১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেন। কাজী জাফর ১৯৬২-১৯৬৩ সালে অবিভক্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (এপসু) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
১৯৬২ সালে সামরিক শাসন ও শরীফ শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনে কাজী জাফর আহমদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রজীবন শেষে তিনি শ্রমিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। ১৯৭২-১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তখন ছিলেন ন্যাপের চেয়ারম্যান। এরপর ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টির (ইউপিপি) প্রথমে সাধারণ সম্পাদক ও পরে চেয়ারম্যান হিসেবে সক্রিয়ভাবে পার্টির সাংগঠনিক দায়িত্ব ও জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ কার্যকরি ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী পরিষদের শিক্ষামন্ত্রী হন।
১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির জন্মলগ্ন থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়ার প্রশ্নে এরশাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে নিজেই ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করেন।
১৯৮৬-১৯৯০ সালে তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির সরকারে পর্যায়ক্রমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বন্দর-জাহাজ ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ১৯৮৯-১৯৯০ সালে বাংলাদেশের অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৬-১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের উপনেতা ও ১৯৮৯-১৯৯০ সালে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন। ১৯৮৬-১৯৯৬ পর্যন্ত পরপর তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক জীবনের বাইরেও ১৯৯৯-২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় University of Western Sydney তে Visisting Distinguished Professor হিসেবে দক্ষিণ এশীয় ভূ-মণ্ডলীয় রাজনীতি বিষয়ে অধ্যাপনাও করেন কিছুদিন।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও কাজী জাফর আহমদ ছিলেন পরিচিত মুখ। ১৯৭৮ সালে তিনি এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় শিক্ষামন্ত্রী সম্মেলনে সহ-সভাপতি, ১৯৭৭-১৯৮৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল জুচে (স্বনির্ভর) ইনস্টিটিউটের পরিচালক, ১৯৮৬ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এসকাপ (ESCAP) ট্রেড মিনিস্টারস্ সম্মেলনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৮৭-১৯৮৮ সালে এশীয় ৭৭ জাতি মন্ত্রিপরিষদের চেয়ারম্যান, ১৯৮৭ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ৭ম আঙ্কটাড সমাপ্তি অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ভূমিকা পালন করেন কাজী জাফর।
এএইচ





