বাংলাদেশে বিগত ৪০০ বছর ধরে পালিত হয়ে আসা শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিলে প্রথমবারের মতো হামলার ঘটনা ঘটলো শনিবার (২৪ অক্টোবর ২০১৫)। ঘটনার পর এ পর্যন্ত পুলিশ সন্দেহভাজন তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বে কোন অবহেলা ছিল কি-না সেটি জানতে একটি তদন্ত কমিটি করা ছাড়াও পুরো তদন্তই একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মুনতাসীর ইসলাম বলছেন, বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে।

মুনতাসীর ইসলাম বলছেন, “তদন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তিনজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে অবিস্ফোরিত বোমা এবং বিস্ফোরিত বোমার স্প্রিন্টারসহ আরো কিছু দ্রব্য।”

পুলিশ প্রধান শহীদুল হক অবশ্য ইতোমধ্যেই বলেছেন হোসেনী দালানে ওই হামলার জন্যে তার ভাষায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিই দায়ী। এমনকি বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় পুলিশ কর্মকর্তা খুনের সাথেও এর যোগসূত্রের কথা বলেছেন তিনি।

সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় শহীদুল হক বলেন, “ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চায় তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। বৃহস্পতিবার এসআই খুনের সাথেও তারা জড়িত। ওই ঘটনায় যাকে আটক করা হয়েছে এবং তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী কামরাঙ্গিরচর থেকে যেসব ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে তার সাথে এখানে যেগুলোর বিস্ফোরণ হয়েছে তার মিল রয়েছে।”

দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দূর্গাপুজা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শিয়াদের ওপর ওই হামলার পর প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও।

ঢাকার গণমাধ্যম কর্মীদের তিনি বলেন, “অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে, আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সর্বশক্তি দিয়ে তাদের ধরবো আমরা।”

এদিকে পুলিশ ও র‍্যাবের কয়েকটি টীম হোসেনী দালান এলাকা থেকে ত্রিশটির মতো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে। অবিস্ফোরিত বোমা পরীক্ষার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে এগুলো হাতে তৈরি বোমা যেগুলোকে হাতে তৈরি গ্রেনেডও বলা হয়ে থাকে।

তবে মামলা কিংবা তদন্ত যে পর্যায়েই থাকুক না কেন কিংবা হামলার কোনো ক্লু পাওয়া না গেলেও রাজনৈতিক দল যথারীতি পরস্পরকে দোষারোপ করতে শুরু করেছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ করছেন। তবে শনিবার দুপুরেএক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দোষারোপ বন্ধ করে তার ভাষায় প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। সুষ্ঠু তদন্ত করে মূল দোষীদের বের করা দরকার। না হলে এটা একসময় ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে যাবে, হাতের বাইরে চলে যাবে।”

ওদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বিতর্কিত এক ইহুদি নারী কর্তৃক পরিচালিত 'সাইট' নামে একটি ওয়েবভিত্তিক নজরদারি প্রতিষ্ঠানকে উদ্ধৃত করে বলছে ঢাকায় শিয়াদের ওপর বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

পুলিশ বলছে তদন্তের সময় এটি খতিয়ে দেখা হবে। কিন্তু তাদের বিশ্বাস আইজিপির কথাতেই যেখানে তিনি বলেছিলেন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্যে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

এদিকে, ঘটনার পর বিভিন্ন বেসরকারী টেলিভিশনে টকশোতে একযোগে আলোচনার প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয় হোসেনী দালান এলাকায় শিয়াদের ওপর চালানো ওই হামলার ঘটনা।

তবে, কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই ঢালাওভাবে জামায়াত-শিবির ও বিএনপিকে দায়ী না করে সুষ্ঠু তদন্কসাপেক্ষে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শক্ত হাতে ও নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে বিষয়টির তদন্ত করারও পরামর্শ দেন টকশোতে আসা রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। (সূত্র : নয়াদিগন্ত ও বিবিসি

কেবি