এটিই আন্দোলনের নতুন কৌশল, নাকি গতি ঠিক করতে পারছে না রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। এমন প্রশ্ন এখন দেশের মানুষের মনে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দলটির সাংগঠনিক পুনর্গঠন থেকে শুরু করে দাবি আদায়ে রাজপথের আন্দোলন সবকিছুতেই ডিমেতালে ভাব। দীর্ঘদিন পর ঢাকা মহানগরীতে নতুন কমিটি দেওয়া হলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি আসেনি সাংগঠনিক কার্যক্রমে।

থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনে দুই মাসের সময় বেঁধে দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত একটি থানারও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। যদিও কমিটি গঠনের সময় বেঁধে দেওয়া ২ মাস সময়সীমা এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।

ঈদের পর সরকার পতনের লক্ষ্যে কঠোর কর্মসূচি আসছে এমন খবরে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা নড়েচড়ে বসেছিল। কিন্তু মাঠের চিত্রে দেখা গেল দু-তিনটি প্রতিবাদ সমাবেশ আর দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসুচির মধ্যে আটকে আছে হাইকমান্ডসহ অন্য নেতাদের ঘোষিত কঠোর কর্মসুচি।

তবে এ নিয়ে দলটির নেতারা এখন বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে দিন তারিখ ঠিক করে আন্দোলন বা সরকার পতন হয় না। কিন্তু তারা এটিও মনে করেন যে, দেশের বর্তমান অবস্থায় যে কোনো সময় গণবিষ্ফোরণ ঘটতে পারে।

অন্যদিকে তৃণমূলের তোপের মুখে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে বিএনপির জেলাপর্যায়ে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। এ ছাড়া দলের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ডও দীর্ঘদিন ধরে মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলসহ প্রায় সবগুলোই মেয়াদোত্তীর্ণ। কমিটি হচ্ছে হবে বলে মাসের পর মাস চলে যাচ্ছে। সরকারবিরোধী দুর্বার আন্দোলনের আগে সব কমিটি পুনর্গঠনের অপেক্ষায় বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।

ঢাকা মহানগর সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন পর ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের জন্য তাদের দুই মাসের সময় বেঁধে দেন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

কিন্তু ইতিমধ্যে ২ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত একটি থানা বা ওয়ার্ডের কোনো কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।

অঙ্গ সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি গঠন নিয়ে হাঁকডাক চললেও ছাত্রদলের কমিটির চূড়ান্ত করতেই হিমশিম খাচ্ছে বিএনপির হাইকমাণ্ড।

ছাত্রদলের সঙ্গে গতমাসে ৩দফা বৈঠকও করেছেন বিএনপি চেয়াপারসন। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, ছাত্রদলের কমিটির কারণে আমি অন্য কমিটি দিতে পারেছি না। কারণ হিসেবে বলেছিলেন যারা ছাত্রদল থেকে বাদ পড়বে তাদের অন্যান্য স্থানে পদায়ন করা হবে।

এরপর সব কিছু চুড়ান্ত করা হলেও রহস্যজনক কারণে এখন পর্যন্ত কমিটি ঘোষিত হয় নি। তবে এরমধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র আর বিবাহিত-অবিবাহিত দ্বন্দ এখন চরম পর্যায়ে।

নতুন কমিটি অপেক্ষাকৃত জুনিয়রদের দিয়ে হচ্ছে এমন ঘোষণায় বর্তমান কমিটির বয়ষ্ক নেতাদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে এ নিয়ে তারা প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ছেন। যার ফলে চুড়ান্ত হয়েও কমিটি ঘোষণা আটকে আছে।

এদিকে যুবদলের কমিটির নিয়েও একই অবস্থা। বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকনের নেতৃত্বে নতুন আহ্বায়ক কমিটি আসার কথা থাকলেও সদস্য সচিব কে হবেন তা নিয়ে কয়েকজনের নাম আসায় বেকায়দায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এ কারণে আপাতত ঝুলে গেছে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি।

অন্যদিকে দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ১৪টি জেলায় পুরনো কমিটি ভেঙে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এতেও খুব একটা সুফল আসেনি। কেননা গতি আসার বদলে আরও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এসব জেলাগুলোর নেতাকর্মীরা।

কোন্দল বাড়তে থাকে জেলাগুলোতে। কমিটি গঠনের সময় দেড় মাস সময় বেধে দিলেও প্রায় ৫ মাসেও ওইসব জেলাগুলোর একটিতেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

তবে দলটির নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো পুরোপুরি গুছিয়েই কঠোর আন্দোলনে যেতে চায় তারা। আর এজন্য আগামী কোরবানির ঈদ পর্যন্ত নরম কর্মসূচিতেই সময় কাটাতে চান দলের নীতিনির্ধারকরা।

এরই মধ্যে দল গোছানোর কাজও শেষ হয়ে যাবে। তারপরেই সর্বাত্মক আন্দোলনের পথে যাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট।

এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, বিএনপির আন্দোলন চলমান। একইসঙ্গে দলের পুনর্গঠন কাজও অব্যাহত রয়েছে। তবে আন্দোলনের মাত্রা কতটা তীব্র হবে সেটি সময় বুঝে দলের হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের গণ বিরোধী আচরণ দিন দিন যেভাবে বাড়ছে তাতে সরকারকে খুব বেশি সময় দেয়া উচিত নয়। যদি সরকার দ্রুত গণতন্ত্রের পথে ফিরে না আসে তাহলে কঠোর কর্মসূচির বিকল্প নেই।

গতকাল (বুধবার) একটি আলোচনা সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেছেন, হতাশ হওয়ার কিছুই নেই বিএনপি চেয়ারপারসনের ছক মোতাবেক আন্দোলন এগিয়ে যাচ্ছে।

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের ৯ বছরের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সফল হবেন।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি গঠনের ব্যাপারে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে নগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস বলেন, সময়সীমা বেধে দিয়ে রাজনীতি হয় না।

তাছাড়া ঈদের পর থেকেই বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে নেতাকর্মীদের ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। তাছাড়া আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পরে যথা সময়ে আামাদের কাজ শুরু করতে পারিনি। তাই কোন দিন তারিখ দিয়ে পুর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন সম্ভব নয়।

চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বিএনপি দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমেই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবী আদায় করতে সক্ষম হবে।

ঢাকা, এমএইচ, ১৮ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসআর