বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত বিতর্কিত ফারাক্কা বাঁধকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করে এ প্রস্তাব দেন তিনি।
দুই নেতার বৈঠক সম্পর্কে বিবিসি বাংলা, এনডিটিভিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বিহারের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন বিহারের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার। বৈঠকের আগে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গায় বিপুল পরিমাণ পলি জমছে। আর এ কারণে প্রতিবছর বিহারে বন্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, এর একটা স্থায়ী সমাধান হলো ফারাক্কা বাঁধটাই তুলে দেওয়া। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশের আপত্তি দীর্ঘদিনের। এই প্রথম ভারতের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক ও মুখ্যমন্ত্রী ফারাক্কা বাঁধ তুলে দেওয়ার কথা বললেন।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ করা হলে পানি–সম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘জেনে-বুঝে কাল (বুধবার) এ বিষয়ে কথা বলব।’
তবে যৌথ নদী কমিশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এমন একজন সাবেক সদস্য বলেন, নদীর ওপর বড় বাঁধ দিলে তা যে শেষ পর্যন্ত হীতে বিপরীত হয়, তার প্রমাণ হচ্ছে ফারাক্কা বাঁধ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সদস্য বলেন, এই বাঁধ দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গার নাব্যতা বজায় রেখে কলকাতা বন্দর চালু রাখা। এই বাঁধের কারণে গঙ্গার ভাটি এলাকা বাংলাদেশে পানি কমে গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাঁধের বিভিন্ন ফটকে পলি জমে এখন বিহারেও বন্যা হচ্ছে। এসব প্রতিক্রিয়া হবে তা অনেক বিশেষজ্ঞই বলেছিলেন। এখন সমস্যা চোখের সামনে ঘটতে শুরু করায় ভারতীয় রাজনীতিবিদেরাও টের পেলেন।
নীতিশ কুমার বলেন, ‘আগে যেসব পলি নদীর প্রবাহে ভেসে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত, এখন ফারাক্কার কারণে সেটাই নদীর বুকে জমা হয়ে বন্যা ডেকে আনছে। তাই আমি ১০ বছর ধরে বলে আসছি, এই পলি ব্যবস্থাপনা না করলে বিহার কিছুতেই বন্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে না।’
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কোনো পয়সা চাই না, কিন্তু চাই কেন্দ্রীয় সরকার বা তাদের সংস্থাগুলো এসে দেখুক কীভাবে এই পলি সরানো যায়। এর একটা রাস্তা হতে পারে ফারাক্কা বাঁধটাই হটিয়ে দেওয়া। আর আপনাদের কাছে বিকল্প কোনো প্রস্তাব থাকলে সেটাও অনুসরণ করে দেখা যেতে পারে।’
নীতিশ কুমারের এ কথা থেকেই স্পষ্ট, বিহারে প্রতিবছরের বন্যার জন্য তাঁর সরকার প্রধানত ফারাক্কা ব্যারাজকেই দায়ী করছে।
বিবিসি বাংলা দাবি করেছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিহার সরকারের পক্ষ থেকে একটি তালিকা তুলে দেওয়া হয়। এতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ হওয়ার আগে ও পরে বিহারে গঙ্গার গভীরতা বা নাব্যতা কতটা কমেছে, তার হিসাব তুলে ধরা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পশ্চিমবঙ্গের নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র বলেন, নীতিশ কুমার ঠিক কী বলেছেন, তা তিনি জানেন না। জেনে এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন।
বিহার প্রদেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এখন প্রায় ১০০ গেট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দেশটির কেন্দ্রীয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সমীর সিনহা জানিয়েছেন। বিহারে বন্যায় ১০ লাখের বেশি মানুষ ও দুই লাখ মানুষের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারতের কর্মকর্তারা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো খুলে পানি ছেড়ে দিলে বিহার রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
সমীর সিনহা জানিয়েছেন, ফারাক্কায় ১০৪টি গেটের মধ্যে এখন প্রায় ১০০ গেট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ গেটগুলো খুলে দিলে ১১ লাখ কিউসেক পানি সরে যাবে, যাতে করে বিহারের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। আর ফারাক্কার গেটগুলো খুলে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশকে আগেই নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছে এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে বাংলাদেশে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, ১১ লাখ কিউসেক পানির প্রবাহ যদি বাংলাদেশের ভেতরে আসে, তাহলে বাংলাদেশ অংশে পদ্মায় পানি বাড়বে, কিন্তু বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না। এখন ব্রহ্মপুত্র-যমুনায়ও পানি কমছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ খন্দকার বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ভেতরে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার ভেতর দিয়ে সবচেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত হয়। এখন এই মুহূর্তে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি কমতির দিকে। সুতরাং আমরা যেটা মনে করছি সেটা হলো, একটা নদীর পানি বৃদ্ধিতে বড় বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি না-ও হতে পারে। ফারাক্কা বাঁধের গেট খোলার তথ্য আমার কাছে নেই। কী পরিমাণ পানি আসবে, বুঝতে পারছি না। বিপৎসীমা অতিক্রম করবে কি না, বলতে পারছি না। পানি এলেই বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হবে, এমনটা আমরা মনে করছি না।’
এম এ





