শেষ হল ছাত্রলীগের ২৮ তম সম্মেলন-১৫। সারাদেশের বাছাইকৃত কাউন্সিলরদের ভোটে সরাসরি সভাপতি পদে সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে এস এম জাকির হোসেন নির্বাচিত হয়েছেন। প্রত্যেক জেলা এবং শাখা থেকে মোট ২৫ জন করে কাউন্সিলররা ভোট দিয়েছেন।
আগের মতো এবারও ছাত্রলীগের সম্মেলন থেকে শুধু সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা হবে না নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতা আসবে তা নিয়ে সংশয় ছিল সবার মাঝে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই ঘোষণা করেন এবার সরাসরি ভোটের মাধ্যমে ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবে।
তারই ধারাবাহিকতায় সভাপতি হিসেবে সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে এস এম জাকির হোসেন নির্বাচিত হয়েছেন।
কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও ছাত্রলীগের সম্মেলন থেকে শুধুমাত্র সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হয়েছে, গঠন করা হয়নি পূর্ণাঙ্গ কমিটি। আগের ধারাবাহিকতায় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পরে গঠন করবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি।
এ প্রক্রিয়ায় পদ বিক্রি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশংকা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সম্মেলনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা না হলে অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ছাত্রলীগে পদ নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাধারণত সম্মেলনে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণার পর তাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা সাবেক নেতাদের মত ও পরামর্শ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করেন।
কিন্তু ছাত্রলীগের সর্বশেষ দুই কমিটির বিরুদ্ধেই পদ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার সুযোগ পাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠে বলে মনে করেন সাবেক ছাত্র নেতারা।
বর্তমান কমিটি ২০১১ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ২০১। কয়েক দফায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করায় সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল চার শতাধিক বলে অভিযোগ করেন ছাত্রলীগ নেতারা।
পদ বাণিজ্যের মাধ্যমেই কমিটির কলেবর দ্বিগুণ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সময় অনেককে গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু বাস্তবে ওই নেতাকে সংশ্লিষ্ট পদ দেয়া হয়নি।
২০১ সদস্যের কমিটিতে তার নাম নেই। ফলে সংগঠনের ওয়েবসাইটেও তাদের নাম ওঠেনি। অথচ ওই নেতার কাছে, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত পদ প্রাপ্তির বিষয়ে চিঠি আছে। সেই চিঠি ভাঙিয়ে তদবির, চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজি করছে বলে তৃণমূল থেকে অভিযোগ উঠেছিল।
পদ বাণিজ্যের বিষয়টি আরও ওপেন সিক্রেট জেলা ও বিভিন্ন ইউনিট কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে বড় অংকের টাকার খেলা হয়ে থাকে। ছাত্রলীগের সর্বশেষ পাবনা জেলা ও মিরপুর বাঙলা কলেজের কমিটি গঠন নিয়ে এমন বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা বলেন, প্রতিটি সম্মেলনের আগে নেতৃত্ব প্রত্যাশীরা নিজ নিজ প্যানেল ঘোষণা করেন। ২০১১ সালের সম্মেলনে দুটি প্যানেল ছিল। কিন্তু এবার সম্মেলনের মাত্র একটি প্যানেলই ছিল। মূলত কোন প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্ব আসবে তা নিয়ে দ্বিধার কারণেই প্যানেল ঘোষণা করেন নি সংশ্লিষ্টরা।
এবার নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব আসলেও আলোচিত ছিল সিন্ডিকেট। পদ বঞ্চিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, একটি প্রহসনের নির্বাচন করার জন্য পছন্দের ব্যক্তিদের কাউন্সিলর বানিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের জেতানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল এ সিন্ডিকেট।
রংপুর জেলা থেকে পাঠানো কাউন্সিলর তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ মাত্র ৪ জন কাউন্সিলর হিসেবে আছেন। বড় বড় পদধারী নেতাদের বাদ দিয়ে কমিটির বাইরের ২১ জনকে কাউন্সিলর মনোনীত করে তালিকা পাঠানো হয়েছে।
অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া কাউন্সিলর তালিকা তৈরির বিষয়টি বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এ কারণে সিন্ডিকেট বিরোধীরা চেয়েছিলেন, এবার নির্বাচন নয়, সমাঝোতার মাধ্যমে অথবা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নতুন নেতাদের নাম ঘোষণা করুন।
নেতৃত্ব প্রত্যাশীরা বলেন, এবার বয়স নিয়েও ধূম্রজাল তৈরি করা হয়েছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নেতৃত্ব প্রত্যাশীদের বয়সসীমা সাতাশ হলেও ছাত্রলীগের আলোচিত সিন্ডিকেট মৌখিকভাবে তা বাড়িয়ে ২৯ বছর করেছে। সেই বয়স সীমাতেই (২৯ বছর) গত দুই কমিটির নেতৃত্ব আসে। কিন্তু এবার নেতৃত্ব প্রত্যাশী অনেকের অভিযোগ যথাসময়ে সম্মেলন হলে তারা শীর্ষ দুই পদে প্রতিযোগিতার সুযোগ পেতেন। কিন্তু দুই বছর পর সম্মেলন হওয়ায় তাদের বয়স পার হয়ে গেছে।
বিশেষ করে অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক শামসুল কবীর রাহাত ও তার অনুসারীদের অভিযোগ, তার বয়স (রাহাতের) ২৯ বছর পূর্ণ হয়েছে জুনে। তাকে বাদ দিতে ইচ্ছে করেই জুলাইয়ে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একাধিক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন ও বর্তমান সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমকে কিছু নতুন নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেতৃত্ব বেছে নিতে এবং গত দুই কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের এলাকা এড়িয়ে অন্যান্য এলাকা থেকে নতুন নেতৃত্ব আনার পরামর্শও দেন। সেক্ষেত্রে বৃহত্তর ফরিদপুর, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলের নেতৃত্ব প্রত্যাশীদের অগ্রাধিকার থাকছে। তবে এটাকেও সিন্ডিকেটের নতুন প্রপাগান্ডা বলে মনে করেছ সিন্ডিকেট বিরোধীরা।
ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগও অঞ্চলের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছিলেন, ‘নেত্রী এ ধরনের কোনো কথা বলেননি। নেত্রী বলেছেন, যারা মেধাবী, যোগ্য এবং দলের জন্য পরিশ্রম ও ত্যাগ করেছেন তাদের নেতা বানাতে’।
ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জয়দেব নন্দী দেয়া তথ্য মতে, দেশে ১০১টি ইউনিটে কাউন্সিলরের সংখ্যা ২৫২৫।
তবে বিদেশের ১১টি ইউনিট থেকে ২৫ জন করে নাও আসতে পারেন। যে ক’জন আসবেন তাদের কাউন্সিলর হিসেবে গণ্য করা হবে।
ছাত্রলীগের শীর্ষ পদে আসতে এবার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ২৪১ জন। এর মধ্যে সভাপতি পদে ৭৮ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ১৬৩ জন ফরম কিনেছিলেন।
এছাড়া এ সম্মেলনে প্রায় সাত হাজার ডেলিগেটকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ছাত্রদলের নেতাদের কেউ।
ইআর





