বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীরের ফাঁসির রায়ের পর থেকেই পাবনার মানুষের মনে দু:খ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যার প্রমাণ মিলেছে তার নিজ এলাকায় সাঁথিয়ায়। সরোজমিনে গিয়ে দেখা যায় যে, মাওলানা নিজামীর লাশের অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষ রাতের ঘুম হারাম করে বিষন্ন হৃদয়ে চাতক পাখির ন্যায় রাস্তার দিকে চেয়েছিলেন।
ঠিক যখন ঘড়ির কাটায় ভোর ৬.৩০ মিনিট তখন মাও. নিজামীর মরদেহ এসে পৌঁছালো নিজ জন্মস্থান মনমথপুরে। পাঁচ স্থরের ব্যারিকেড ভেঙ্গে মানুষের ঢল নামলো মনমথপুরে এক নজর মাও. নিজামীকে দেখার জন্য।
জানাযা শুরুর আগে পুলিশ কিছুটা হলেও তাদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উপনিত হলেও সাধারণ মানুষের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসের কাছে তা পরাজিত হয়েছে। পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। একথা স্বীকার করেছিলেন সহকারী পুলিশ সুপার সিদ্দিকুর রহমানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
সকাল ৭ টায় মনমথপুরের কবরস্থান মাঠে প্রথম জানাযা নামায শুরু হলো নামাযের ইমামতি করেন তার ছেলে ব্যারিষ্টার নাজিব মোমেন। জানাযা শেষে বাবা ও মায়ের কবরের পাশে মাও. নিজামীকে শায়িত করা হলো সকাল সাড়ে সাতটায়। কবরস্থানের চারিদিকে পুরুষের পাশাপাশি মহিলারা একটু দুরে দোয়ায় শরীক হওয়ার জন্য অবস্থান করেছিল।
জানাযায় উপস্থিত সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির সহ সভাপতি শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিলদার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সালাউদ্দিন খান বলেন, আমি দীর্ঘদিন মাও. নিজামীর সাথে রাজনীতি করে এসেছি তিনি ছিলেন শুধু পাবনার নয় গোটা বাংলাদেশের একটি সম্পদ। যার কথা বিশ্বের মানুষেরা অকপটে স্বীকার করেছেন।
তিনি আরও বলেন যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী ও হত্যা, ধর্ষণ এমন কোন বিষয়ের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন না। সরকারের আদালতে তিনি অপরাধী কিন্তু সর্বসাধারণ পাবনাবাসী তথা গোটা জাতির আদালতের কাছে তিনি নিষ্পাপ।
এসময় উপস্থিত সাথিয়ার ধোপাদহ ইউনিয়নের বাসিন্দা মুদি দোকনদার অরুণের কাছে নিজামী সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা হিন্দু হলেও আমাদের উপর নিজামী সাহেব কখনও অন্যায়, অত্যাচারমূলক কর্মকাণ্ড করতে দেখিনি।
তিনি বলেন, তিনি সৎ ও যোগ্য নেতা ছিলেন। আর একারনেই তিনি দলমত নির্বিশেষে তিনবার সাংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, আমার ভাইয়ের চাকরির ব্যপারে যখন তার কাছে গিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম স্যার আমরা হিন্দু বলে আমাদের কি চাকরি হবে না ? জাবাবে তিনি বলেছিলেন তোমার ভাইকে পরীক্ষা দিতে বল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই তার চাকরী হবে। পরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো এবং কোন প্রকার ঘুষ ছাড়াই আমার ভাইয়ের সরকারী চাকরি হলো। একথা বলতে বলতে তিনি চিৎকার করে কেঁদে ফেললেন।
৭৬ বছর বয়সী বৃদ্ধ সানাউল্লাহ ফকিরকে মাও. নিজামী সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন নিজামী আমার সমবয়সী সে এধরণের কোন অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন না। উনি লুৎফারের একমাত্র ছেলে যে সবসময় আল্লাহ ও তার রাসুলের আদর্শে নিজের জীবন পরিচালিত করেছেন।
১৭ বছরের তরুণ ফাহিম বলেন, নিজামী সাহেব আল্লাহর ওলি ছিলেন। ছোট বড় সকলের সাথে নম্র ও মধুর ব্যবহার করতেন। এজন্য সকলের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। আপনি তার বাড়িটা দেখলে বুঝতে পারবেন যে একজন মন্ত্রীর বাড়ি চারচালা টিনের। তিনি দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতের কথা বেশি ভাবতেন।
কেন জানেন না ? ফাঁসির আগে যখন তাকে গরুর মাংস ও উন্নতমানের খাবার দেওয়া হয়েছিল তিনি তা না খেয়ে খেয়েছিলেন সবজি ও মাছের ঝোল।
সে আরও বলেন, তার ব্যবহার ছিল সবার থেকে আলাদা তিনি একজন খাঁটি মানুষ একথা বলতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
দাফনের পর কবরস্থানসহ পুরো এলাকায় কান্নার চিৎকারে সকল কিছু নিস্তব্দ হয়ে গিয়েছিল। কান্নার শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। সবকিছু যেন নিথর নিস্তব্দ হয়ে গেছে এক নিজামীর শোকে।
এআই/এমআর





