দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবীতে আন্দোলন করে আসছিল। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে বিরোধী জোটের এই আন্দোলনের যখন চুড়ান্ত পর্যায়ে তখন সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপের জন্য শর্ত জুড়ে দেয়া হয় বিএনপি জোট থেকে জামায়াতকে বাধ দিলেই কেবল বিএনপির সাথে সংলাপ হতে পারে।
এ নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে নানা গুঞ্জনও শুনা যায়। ১৮ দলীয় জোট ভেঙ্গে যাচ্ছে। এটি এখন সময়ের ব্যাপার। সরকারের শর্ত মেনেই জোট ভাঙ্গার পথে বিএনপি এগুচ্ছে। এটি আরো দৃশ্যত হয়ে ওঠে ২০ জানুয়ারি পূর্বঘোষিত ১৮ দলীয় জোটের একটি কর্মসুচিকে ঘিরে। ৫ জানুয়ারি একদলীয় ও প্রহসনের নির্বাচনে ভোট বর্জন করায় ওইদিন দেশবাসীকে আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ জানানোর কর্মসুচি ছিল ১৮ দলের পক্ষ থেকে। কর্মসুচির একদিন আগে বিএনপির পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়, এটি ১৮ দলের নয় বিএনপির কর্মসুচি। এরপর পর থেকেই ১৮ দলীয় জোটের শরীকরা জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় পরে যান। এ নিয়ে জোটের নেতৃত্বে থাকা বিএনপির দ্বায়িত্বশীল কোনো নেতার পরিষ্কার বক্তব্য পাওয়া না গেলেও গণমাধ্যমে বিভিন্ন সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে।
অবশেষে ১৮ দলীয় জোট ১৯ দলীয় জোটে পরিণত হওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার বিরোধী জোট আরো সুদৃঢ় হল। এমনটিই মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধা মহল।
২৫ জানুয়ারি শনিবার রাত ৯টায় গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ১৮ দলে যোগদান করায় এখন এটি ১৯ দলে পরিণত হয়েছে।
১৮ দলীয় জোট যেভাবে ১৯ দলীয়: এরশাদের জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেওয়ায় গত ২৩ নভেম্বর এক বিবৃতিতে এরশাদকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ।
এই বক্তব্যের পরই জাফরকে দল থেকে বহিষ্কারের গুঞ্জন উঠলেও তা নাকচ করে এরশাদ সে সময় বলেন, ‘অভিমানী` কোনো বক্তব্যের কারণে তিনি কাউকে শাস্তি দেবেন না। জাফর জাতীয় পার্টির সঙ্গেই থাকবেন। কিন্তু জাফরকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বলেন এরশাদ।
কিন্তু ২৭ নভেম্বর বুধবার কাজী জাফর সংবাদ মাধ্যমের কাছে ‘নীতির প্রশ্নে’ অটল থাকার কথা বলার পর বৃহস্পতিবার তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তারপর তিনি এরশাদকে পাল্টা বহিষ্কার করে গড়ে তুলেন আলাদা জাতীয় পার্টি।
এরপর থেকে নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকারের দাবিতে ১৮ দলের আন্দোলনের সাথে সমর্থন জানিয়ে আসছিলেন কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। অবশেষে ২৫ জানুয়ারি আনুষ্টানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে ১৮ দলে যোগ দিলেন কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি।
ছাত্রজীবনে পিকিংপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির পর ১৯৬৬ সালে চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন কাজী জাফর। স্বাধীনতার পর মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। পরে ১৯৭৪ সালে আসেন ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস পার্টিতে।
১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকারে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন তিনি।
জেনারেল জিয়ার হত্যাকান্ডের পর জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করলে তার সরকারে যোগ দেন কাজী জাফর আহমদ। ১৯৮৯ সাল থেকে ’৯০ পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল চারদলীয় জোট সম্প্রসারিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটে।
এর আগে ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী সরকার বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট গঠিত হয়েছিল। ওইদিন তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, তৎকালীন জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম আযম এবং ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক এক যৌথ ঘোষণা দিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করেন। ঘোষণার এক মাসের মধ্যে সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়। এরপর ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বর খালেদা জিয়াসহ চার দলের এই চার শীর্ষ নেতা তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবন ২৯ মিন্টো রোডে এক বৈঠকের পর এক ঘোষণাপত্রে নিজ নিজ দলের পক্ষে স্বাক্ষর করেন। ওই ঘোষণায় সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে দেশের সব জাতীয়তাবাদী শক্তি, গণতন্ত্রকামী ও ইসলামী দলসহ সব শ্রেণী ও পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। সেই সঙ্গে দেশজুড়ে পাড়ায়-মহল্লায়, শহরে-বন্দরে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান জানানো হয়।
১৯৯৯ সালে যৌথ ঘোষণার খসড়া তৈরির সাব-কমিটির প্রধান ছিলেন বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। যদিও তার তৈরি ওই খসড়ার অনেক কিছু পরে কাটছাঁট করা হয়েছে। তখন চারদলীয় জোট গঠনের অন্যতম রূপকার ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা প্রয়াত আনোয়ার জাহিদ। ওই সময় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, এম শামসুল ইসলাম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মির্জা আব্বাস, ফজলুর রহমান পটল, বরকতউল্লা বুলু, ফেনীর মোশাররফ হোসেনসহ দলের বড় একটি অংশ জামায়াত ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে জোট গঠনের পক্ষে থাকলেও নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেন আনোয়ার জাহিদ।
[b]ঢাকা,২৬ জানুয়ারি(টাইমনিউজবিডি)//এমএইচ[/b]
রাজনীতি
১৮ থেকে যেভাবে ১৯ দলীয় জোট
দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবীতে আন্দোলন করে আসছিল। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে বিরোধী জোটের এই আন্দোলনের যখন চুড়ান্ত পর্যায়ে তখন সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপের জন্য শর্ত জুড়ে দেয়া হয় বিএনপি জোট থেকে জামায়াতকে বাধ দিলেই কেবল বিএনপির সাথে সংলাপ হতে পারে।





