যার নির্দেশে এক সময় বাঘে-মহিষে একঘাটে পানি খেত (দলের নেতারা তার আদেশ নির্দেশ পালন করতে পারলে ধন্য হতেন) সেই জাতীয় পার্টি (এরশাদ) চেয়ারম্যান সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ নিজ ঘরে (দল) পরবাসী।
তার কথা এখন কেউ শুনছেন না সিদ্ধান্ত মানছেন না। নির্বাচনের সময় তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে (ভোট করে পরাজিত হয়ে) বিশ্বাসঘাতকতা করা সিন্ডিকেট সদস্যরা আবার ফিরে এলেও চরম বেকায়দায় পড়ে গেছেন তিনি।
একদা নির্দেশ পালনের জন্য যারা মুখিয়ে থাকতেন তারা কেউ তার (এরশাদ) কথা আমলে নিচ্ছেন না। তিনি যে মন থেকে পাতানো নির্বাচন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সকাল-বিকাল অবস্থান পরিবর্তনের কারণে সে সত্যটা কেউ বিশ্বাস করছেন না;বরং সাধারণ মানুষের মতো দলের নেতারাও মনে করছে তিনি পাতানো নির্বাচনে উভয়কুল রক্ষার কৌশল নিয়ে সিএমএইচএ গিয়েছিলেন। মুক্ত হয়ে এখন নিজের নেতৃত্ব নিয়েই চিন্তিত।
নির্বাচনের আগেই একদফা ভাঙনের পর তিনি যে কৌশল নিয়েছিলেন নির্বাচনের পর তা তার জন্য বড় বিপদ এনেছে। আহসান হাবিব লিংকনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতা চলে গেছেন। তার কথায় যারা মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন তাদের ব্যাপারে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে অনেকেই কাজী জাফরের দলে চলে যাবেন বলে ইংগিত দিয়েছেন।
রওশন এরশাদ গৃহপালিত বিরোধী দলীয় নেতা হওয়ার পর দলে কার্যত গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছেন এইচ এম এরশাদ। সংসদ ইস্যুতে সব কাজে তার নাম সবাই ব্যবহার করছে কিন্তু তার কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছে না। এখন তিনি নিজ দলেও ক্ষমতাহীন। স্ত্রী রওশন এরশাদ বিরোধী দলের নেতা হওয়ার পর দলের সুবিধাবাদী মন্ত্রী ও এমপিরা এখন রওশনের পাশে। সুবিধাবাদী নেতারা তার বিপক্ষে গেলেও ‘মহাসচিব পদ’ ধরে রাখার জন্য কৌশলগত কারণে রুহুল আমিন হাওলাদার তার সঙ্গে থাকার ভান করে সংসদীয় দলের সভায় অনুপস্থিত থাকছেন। দলের সংসদীয় দলের বৈঠক হচ্ছে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে। রওশনের নেতৃত্বে স্মৃতিসৌধে ফুল দেয়া হয়েছে এরশাদকে ছাড়াই। সুস্থ থাকার পরও সেখানে প্রচার করা হয়েছে এরশাদ অসুস্থ।
মহিলা এমপি হওয়ার প্রত্যাশায় প্রায় ৯ শতাধিক নেত্রী ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন কিনেছিলেন। কিন্তু তাদের সাক্ষাৎকার ঠিকমতো নেয়া হয়নি। এজন্য অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন টাকা আর সুন্দর চেহারা খোঁজা হচ্ছে মহিলা এমপি করতে। মিডিয়ায় সে খবর প্রচার হয়েছে।
সংরক্ষিত মহিলা আসনে তার (এরশাদ) দেয়া তালিকা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় মুখ রক্ষার জন্য মহাসচিব সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন এখনো মহিলা আসনের তালিকাই করা হয়নি। কারণ সুনীল শুভ রায় এবং রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রীর নাম মহিলা এমপি হিসেবে দেয়া হয়েছিল। আর এরশাদের পালিত কন্যা সোনারগাঁয়ের মৌসুমী আর গাইবান্ধার দিলারা চৌধুরীর নাম দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে যান রওশন এরশাদ। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চীপ হুইপ মনোনীত করা হয়েছে তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে। অথচ এ সম্পর্কে এরশাদের কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি।
এদিকে নির্বাচনের আগে এরশাদের ভোট বর্জনের ঘোষণা এবং মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়ার পর যেসব প্রার্থী সরে দাঁড়িয়েছিলেন তারাও ক্ষোভ আর অভিমান নিয়ে এরশাদ থেকে দূরে রয়েছেন। এ নেতারাও এখন এরশাদকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
দলের মধ্যে এমন অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যেই এরশাদের সামনে হাজির হয়েছে আরেক পরীক্ষা। মঞ্জুর হত্যা মামলার খড়্গ তার মাথার ওপর। মামলার রায়ের তারিখ ১০ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করার পরের দিন এরশাদ বিবৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করায় শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তার সহযোগী হওয়ার ঘোষণা দেন। অথচ এ ঘটনার কয়েকদিন আগে এরশাদ চিঠি দিয়ে বলেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্টকে মন্ত্রীর পদ মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর দূত করা শোভনীয় নয়।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের কয়েকজন সদস্য জানান,তারা নিজেও এখন এরশাদকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিন মাস দেখবেন জাতীয় পার্টির অবস্থা এবং দেশের রাজনৈতিক অবস্থা কোন দিকে যায়। তারপর অন্যচিন্তা করবেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন,আশির দশকে ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেছিলেন,জাতীয় পার্টি নয় ওটা যাত্রা পার্টি। নির্বাচন নিয়ে দলের ভূমিকা এবং সরকারে এবং বিরোধী দলে থাকার সিদ্ধান্তে এখন মনে হচ্ছে প্রবীণ রাজনীতিক অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের ওই বক্তব্যই সঠিক।
এদিকে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে চরম অস্থিরতা। এ অবস্থায় তারা কি করবেন ঠিক করতে পারছেন না। নির্বাচনের আগেই এরশাদকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ এরশাদের নেতৃত্ব ত্যাগের ঘোষণা দেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম মসিহকে মহাসচিব করে তিনি জাতীয় পার্টির কমিটি ঘোষণা করা হয়। কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটে যোগ দিয়েছে। কাজী জাফরের জাতীয় পার্টিতে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সাবেক এমপি যুক্ত হয়েছেন।
এছাড়া এরশাদের নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো আরও কয়েকজন নেতা কাজী জাফরের জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অন্যদিকে নির্বাচনের পরে এরশাদের নেতৃত্বে থাকা জাতীয় পার্টিতেও চরম বিভক্তি দেখা দিয়েছে। সরকারি সুবিধা নেয়া নিয়ে সংসদ সদস্যরা রওশন এরশাদকে ঘিরে ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছেন। এ ক্ষেত্রে দূরে রাখা হয়েছে এরশাদকে। এরশাদ ও তার অনুগত নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়ায় তৃণমূলের কর্মীরাও হতাশ। দিকভ্রান্ত্র অবস্থানে আছেন তারা। কাজী জাফর আহমদ ১৯ দলীয় জোটে গিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় বেশ কয়েকটি জেলা,উপজেলা তথা তৃর্ণমূল পর্যায়ের নেতারা সেদিকে ঝুকে পড়েছেন। তারা ১৯ দলের আন্দোলন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এঅবস্থায় রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা না করলে এরশাদের পক্ষে মাঠ পর্যায়ের দলের নেতাদের ধরে রাখা কঠিন হবে। সবকিছু মিলে [b]নিজ ঘরে পরবাসী হয়ে গেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। (সূত্র ইনকিলাব)
ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি(টাইমনিউজবিডি)// জেআই[/b]