মিথ্যা অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে শাস্তি দেয়ার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াত ইসলামী। বুধবার সন্ধ্যায় দলটির ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের পাঠানো এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। এই মামলায় দু’টি মিথ্যা অভিযোগে সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে তার স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে পিরোজপুরে একটি মামলা দায়ের করেন,মামলা নং-৯। ওই মামলায় মোট ১৩ জনকে আসামী করা হয়। আসামীর সেই তালিকায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম ছিল না। মামলাটিতে ১৯৭২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ চার্জশিট দাখিল করে (নম্বর-২৬)। ওই চার্জশিটেও সাঈদীর নাম ছিল না। এই মামলার এজাহার-এর সার্টিফাইড কপি ২০১১ সালে ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হয়। সেই সাথে জি.আর রেজিষ্ট্রার-এর সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠার কপিও দাখিল করা হয়। যার নাম্বার- ৩৭৮/৭২। ওই মামলার নথিপত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউশন কিংবা ট্রাইব্যুনাল তলব করেননি।
এতে বলা হয়, সাঈদীর পক্ষ থেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলার নথিপত্র তলব করার জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল উক্ত আবেদন খারিজ করে দেন। খারিজের বিপরীতে রিভিউ পিটিশন দায়ের করা হয়। ট্রাইব্যুনাল তাও খারিজ করে দেন। পরবর্তীতে স্কাইপ কেলেঙ্কারীর দায়িত্ব মাথায় নিয়ে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম পদত্যাগ করেন। এর পর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে রিট্রায়াল পিটিশন দায়ের করা হয়। ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন খারিজ করে দেন। ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর পক্ষ থেকে এজাহার ও জি.আর রেজিষ্ট্রার আদালত থেকে তলব করার আবেদন জানানো হয়। মাননীয় ট্রাইব্যুনাল তাও খারিজ করে দেন।
বিবৃতিতে তারা অভিযোগ করেন, ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রীর দায়ের করা মামলার বিষয়টি সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে সরকারের সাজানো ছকে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মাননীয় ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে এই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। মহামান্য সুপ্রীম কোর্টে সাঈদীর পক্ষ থেকে আপীল দায়ের করা হয়। আপীল মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন কালে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীর পক্ষ থেকে পিরোজপুর ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্ট থেকে ১৯৭২ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এ মামলার বিচারিক কার্যক্রমের সকল নথিপত্র তলব করার জন্য মাওলানা সাঈদীর পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট আজ (বুধবার) এ আবেদনটি খারিজ করে দেন।
তারা বলেন, বার বার বলে আসছি,সাঈদী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করে। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার জন্য তার স্ত্রীর দায়ের করা মামলার রেকর্ডসমূহ মহামান্য সুপ্রীম কোর্টে তলব করলে প্রকৃত সত্য উৎঘাটিত হতো। কিন্তু আবেদন খারিজ করে দেওয়ায় মাওলানা সাঈদী ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার গভীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তারা আরও বলেন, ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম,ছেলে মাহবুব,কন্যা রোখছানা,শাশুড়ি সেতারা বেগম,শ্যালক মোস্তফা হাওলাদার,শালিকা রানী বেগম এদের সকলেই জীবিত আছেন। তারা নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। অথচ তাদের কাউকে বা অন্য কোন আত্মীয় এমনকি ওই গ্রামের কাউকেই সাক্ষী করা হয়নি। সরকার নিজেদের দলীয় লোকদের দিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে মামলা সাজিয়ে মাওলানা সাঈদীকে শাস্তি দেয়ার আয়োজন করেছে।
জামায়াত নেতারা বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় যে অভিযোগে মৃত্যুণ্ড দেয়া হয় তা হচ্ছে বিশাবালী হত্যাকান্ড। বিশাবালীর পরিবার,আত্মীয় এমনকি ওই গ্রামের কাউকে সাক্ষী না করে সরকার তার দলীয় লোকদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে শাস্তি দেয়ার ষড়যন্ত্র করে। এই অভিযোগে সরকার পক্ষ বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালীকে সাক্ষী হিসেবে নির্ধারণ করে। কিন্তু সুখরঞ্জন বালী মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেন। তিনি সাঈদীর পক্ষে আদালতে সত্য সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ ব্যক্ত করেন। ২৪ অক্টোবর ২০১২ সাঈদীর পক্ষ থেকে সুখরঞ্জন বালীর সাক্ষী গ্রহণের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানানো হয়। ৪ নভেম্বর ২০১২ সুখরঞ্জন বালী সাঈদীর পক্ষে সাক্ষী দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হন। ট্রাইব্যুনাল সাক্ষী গ্রহণ না করে পরের দিন বিষয়টি শুনবেন বলে দিন ধার্য্য করেন। পরের দিন ৫ নভেম্বর সুখরঞ্জন বালী সাক্ষী দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালের ফটক পর্যন্ত উপস্থিত হতে সক্ষম হলেও সরকার তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। বর্তমানে সুখরঞ্জন বালী ভারতের কারাগারে আটক রয়েছেন। তার আটকের খবর বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। ১৬ মে ২০১৩ বাংলাদেশের প্রায় সকল পত্রিকায় ‘আমাকে হত্যা করা হবে,সাঈদীকে ফাঁসি দেয়া হবে’ শিরোনামে ডেভিড বার্গম্যানের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। উক্ত প্রতিবেদনে ভারতের কারাগারে আটক সুখরঞ্জন বালী ডেভিড বার্গম্যানের নিকট তার অপহরণের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি বলেন,৫ নভেম্বর ২০১২ ট্রাইব্যুনালের ফটক থেকে সাঈদী সাহেবের আইনজীবীর গাড়ি থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। ঢাকার কোন একটি গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয়ে তাকে আটক রাখা হয়। মাসাধিককাল পর তাকে ভারতের সীমান্তে বিএসএফের হাতে হস্তান্তর করা হয় বলে সে জানায়।  
বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণ করার পর সাঈদী সাহেবের আইনজীবীর পক্ষ থেকে শাহবাগ থানায় জিডি দায়েরের জন্য গেলে থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তা ‘উপরমহলের চাপ আছে’ বলে জিডি গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। মহামান্য হাইকোর্টে সুখরঞ্জন বালীর বিষয়ে ‘হেবিয়াস করপার্স’ রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। মহামান্য সুপ্রীম কোর্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী সুখরঞ্জন বালীর বিষয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সুখরঞ্জন বালী সরকার কর্তৃক অপহরণের পূর্বে মিডিয়ায় প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেন,তার ভাই বিশাবালী হত্যাকাণ্ডের সাথে সাঈদী সম্পৃক্ত নন।
তারা বলেন, সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাঈদীকে শাস্তি দেয়ার জন্য ইব্রহিম কুট্টি ও বিশাবালী হত্যাকাণ্ডের দায় তার উপর চাপিয়ে বিচারের নামে প্রহসনের আয়োজন করে। আমরা বার বার ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার পর তার স্ত্রীর দায়ের করা মামলা,মামলার কর্যক্রম ও বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালীর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। কিন্তু সে সব বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ফলে সাঈদীর বিরুদ্ধে সরকারের ষড়যন্ত্র ও তাকে শাস্তি দেয়ার নীল নকশা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে বলে আমাদের গভীর আশঙ্কা। আমরা আরো উদ্বিগ্ন এই কারণে যে,রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এটর্নি জেলারেল স্বপ্রণোদিত হয়ে পিরোজপুর ও বরিশালে মামলার নথিপত্র খোঁজাখুজির জন্য যান। নথি তলব না করা ও এটর্নি জেনারেলের এসব দৌড়ঝাঁপ থেকে প্রতীয়মান হয় সরকার প্রকৃত সত্য ধাঁমাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
তারা বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সরকারের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং দেশবাসীকে সাঈদীর বিরুদ্ধে সরকারের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য আহ্বান জানাই। সেই সাথে অবিলম্বে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিনাশর্তে মুক্তি দাবি করেন জামায়াত নেতারা।
[b]ঢাকা, ১৬ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ[/b]