ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরার আহবান জানিয়েছেন দেশের বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও রাজনীতিবিদরা।
বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে “আর্ন্তজাতিক ফারাক্কা কমিটি” (আইএফসি) আয়োজিত ‘উজানে পানি প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশের বিপর্যয় রোধে সার্বিক ঐক্যমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তারা এ আহবান জানান।
বক্তারা বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। তাই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে ঐক্যমত পোষণ করতে হবে।
ওয়াকার্স পাটির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সার্বিকভাবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা একান্ত প্রয়োজন। তাহলেই ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করা সম্ভব। বিএনপি লংমার্চ নিয়ে গেল আর তিস্তায় পানি এলো এটা পানি পানি খেলা হয়ে গেল। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এমন পানি পানি খেলা না খেলে আসুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে পানি সমস্যা সমাধান করি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যে যদি কোন কথা বলা হয়। তাহলেই বলা হয় আমরা ভারত বিরোধীতা করছি। এটা আসলে তাদের ভুল ধারণা। পানির ব্যাপারে বহু সভা-সেমিনার করছি কিন্তু কোন কাজে আসেনি। আমরা যতদিন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মত জাতীয় ঐক্যমত পোষণ করতে না পারবো ততদিন পর্যন্ত আমাদের এ পানির দাবি আদায় হবে না। তাই দলমত নির্বিশেষে আমাদের জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জেলা, উপজেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই আমাদের দাবি আদায় হবে। যারা দেশের নেতৃত্বে রয়েছেন তাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, জাতীয় সকল সমস্যায় আমরা সকলে আরও কাছাকাছি থাকবো। সরকার যেই থাকুক না কেন নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবো।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আলোচনা করে কিছু হবে না। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই সরকারকে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।
নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি দিয়ে দাবি আদায় হবে না। তারা মোদীর কে কত কাছে যেতে পারে এটা নিয়েই ব্যস্ত। এ রাজনৈতিক দল দুটি পানি আদায় নিয়ে কথা বলবেন কি বলবেন না, তা কেউ বলতে পারে না।
কেননা এখন তারা গদি পাকা-পোক্ত করার জন্য মোদিকে কে, কি দিবেন কে তার কত কাছে যেতে পারেন এ নিয়েই ব্যস্ত রয়েছেন। এদেরকে দিয়ে পানি আদায় করা সম্ভব নয়। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হলে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা করণীয় নির্দিষ্ট করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামতে হবে।
বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন,  বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষকে জানানোর মধ্যে দিয়ে ঐক্যমত গড়ে তুলে ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে। ইতোমধ্যে ভারতের অনেক রাজনৈতিক নেতা উপলব্ধি করেছেন ভারতের স্বার্থেই বাংলাদেশের সঙ্গে পানি চুক্তি করতে হবে।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, ভারতে সঙ্গে পানি চুক্তি করার আগে জনগণকে জানানো উচিত ছিল। কিন্তু তা না জানিয়েই সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এ সময় তিনি সরকারকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পানির ন্যায্য হিস্যার ব্যাপারে জাতিসংঘের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানান।
বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি সম্পদ বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান ও নেপালের যে চুক্তি হয়েছে তাতে পাকিস্তান ও নেপালের অধিকার সংরক্ষিত হয়েছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি।
আইএফসি নিউ ইয়র্ক এর চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান সালু বলেন, পানি সমস্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘে ৬ষ্ঠ কমিটিতে উপস্থাপন করতে হবে। এছাড়াও যেখানে যা করা দরকার বর্তমান সরকারকেই করতে হবে। যেহেতু তিনি প্রধানমন্ত্রী। ভারতের এ পানি আগ্রাসন থেকে আমার মুক্তি চাই।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও আইএফসি বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমানে বাংলাদেশে সফররত তার মাধ্যমে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ এ ম্যাসেসটুকু পৌছে দিতে চাই। এ জন্যই আজকে আমাদের এ আয়োজন। সরকারের কাছে আমাদের দাবি ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে আমাদের পানি সমস্যা সমাধান করবেন। এ সময় তিনি একটি কি নোট পড়ে শোনান।
জাতিসংঘের সাবেক পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং আই এফ সি বাংলাদেশ-এর সিনিয়র সভাপতি ড. এসআই খান “উজানে পানি আগ্রাশন ও বাংলাদেশের বিপর্যয়” শিরোনামে একটি প্রজেক্ট স্কিনে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করে দেখান। এতে ভারতের পানি আগ্রাসনের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষয়-ক্ষতি তুলে ধরেন তিনি।
এ সময় তিনি বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য উজানে পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তোলার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন আইএফসি-এর সমন্বয়ক মোস্তফা কামাল মজুমদার। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আওলাদ হোসেন খান।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব ও পূর্তমন্ত্রী মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একে ফজলুল হক,কলামিষ্ট সাদেক খান, নিউইয়র্ক ফোবানা ২০১৪ কনভেনর হাসানুজ্জামান হাসান, ওয়াশিংটনের কমিউনিটি লিডার সাদেক খান, জয়েন্ট রিভার্স কমিশনের সাবেক সদস্য তৌহিদুল আনোয়ার খান প্রমুখ।
ঢাকা, এমআর, ২৬ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর