ওলামা লীগের দুই গ্রুপ একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে যার যার গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এ লড়াইয়ের অংশ হিসেবে গত শনিবার (১৭ অক্টোবর ২০১৫) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় ইস্যুতে অনুষ্ঠিত ওলামা লীগের মানববন্ধনে হেলালী গ্রুপের স্বশস্ত্র হামলায় ১৫/২০ জন আহত হন। আর এভাবেই এতদিন চাপা থাকা লড়াই প্রকাশ্যরূপ নেয়।
ওলামা লীগের এমন আন্ত-কলহের খবর প্রচার মাধ্যমে ফলাও করে ছাপানো হয়। এর পরই তীব্র বাক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে উভয় গ্রুপ। শুরু হয় একে অপরকে দোষারোপের রাজনীতি। এরই মধ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ও বিবৃতি অব্যাহত রেখেছে উভয় গ্রুপ। 
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মানববন্ধনে হেলালী গ্রুপের স্বশস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত সংগঠনের সহ-সভাপতি মাওলানা আবু বকর ছিদ্দীক রাজধানীর ধোলাইপাড়স্থ ডেলটা কেয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থেকে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
অপরদিকে, হামলাকারীদের বেধরক লাঠিপেটায় সংগঠনের অপর সহ-সভাপতি মাওলানা আব্দুস সোবহানের পাজরের হাড় ভেঙ্গে যায়। বর্তমানে তিনি ১২ নং মিরপুর জেনারেল হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থায় চিকিৎসাধীন।
ওলামা লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা হাফিজ আব্দুস সাত্তার গত বুধবার (২১ অক্টোবর ২০১৫) গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজারের সামনে গেলে ২/৩ জন সন্ত্রাসী তার গতি রোধ করে। এ সময় একজনের রডের আঘাত লাগে তার মাথার একপাশে। এতে আহত হাফিজ সাত্তার ফকিরাপুল মর্ডান ডায়গনস্টিক সেন্টারে গেলে তার মাথায় ব্যান্ডেজ দেয়া হয়।
ওলামা লীগের দুই গ্রুপের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের জন্য হেলালী গ্রুপ এক সংবাদ সম্মেলন করে মাওলানা আখতার হুসাইন বুখারীর ও মাওলানা আবুল হাসান শেখ শরীয়তপুরীর নেতৃত্বে ওলামা লীগকে আইএসের সাথে সম্পৃক্ত জঙ্গি গ্রুপ এবং চাঁদাবাজ দল বলে উল্লেখ করেছেন এবং তার নেতৃত্বাধীন ওলামা লীগ প্রকৃত ওলামা লীগ বলে দাবী করেছেন।
হেলালীর দাবীর প্রতিবাদে বুখারী ও শরীয়তপুরীর নেতৃত্বাধীন ওলামা লীগের প্রতিবাদে বলা হয়েছে, ওলামা লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির কোনো প্রমাণ নেই। ওলামা লীগ কোনো জঙ্গি দল নয়। ওলামা লীগের অপর কোনো সংগঠনের নেতাকর্মী বা তাদের কোনো কর্মসূচির উপর স্বশস্ত্র বা জঙ্গি হামলার ইতিহাস নেই। অথচ হেলালী আদ্যপান্ত একজন চাঁদাবাজ ও দৌড় সালাউদ্দিনের ক্যাডার ছিলো।
তারা আরও অভিযোগ করেন, ২০০৭ সালে ১/১১ সরকার ক্ষমতায় আসলে হেলালী রাতারাতি লেবাস পরিবর্তন করে বাইতুল মোকাররম মসজিদে এসে আখতার হুসাইন বুখারী ও উপস্থিত ওলামা লীগের সকল নেতৃবৃন্দের নিকট ক্ষমা চেয়ে ওলামা লীগে যোগ দেন। সুতরাং হেলালী কখনোই মুল ওলামা লীগের সাথে যুক্ত ছিলেন না।
পরবর্তীতে সে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কিছু ট্রাক ড্রাইভার ও হেলপার নিয়ে হেলালীর নেতৃত্বাধীন ওলামা লীগ ব্যাপক চাঁদাবাজী, নারী কেলেংকারী ও নেশার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে বলেও অভিযোগ করেন বুখারী ও শরীয়তপুরী। পরবর্তীতে সে মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়ার সহযোগীতায় নামে, বেনামে বিভিন্ন মাদ্রাসার নামে প্যাড বানিয়ে সরকারে জিআর/টিআরের চাল ও অনুদান নিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করে। মাদ্রাসা সংস্কারের নামে বিপুল সরকারী টাকা উত্তোলন করে বর্তমানে সে রাজকীয়ভাবে বসবাস করছেন।
বুখারী-শরীয়তপুরী নেতৃত্বাধীন ওলামা লীগের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, হেলালী রাজাকার, তার ভাই রাজাকার, তার পিতাও অস্ত্রধারী রাজাকার। বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জে হেলালীদের পরিবার রাজাকার বাড়ি নামে পরিচিত।
বুখারী ও শরীয়তপুরীর নেতৃত্বাধীন ওলামা লীগের পক্ষ থেকে সাংবাদিকেদের নিকট প্রেরিত প্রত্যায়নপত্র পাঠানো হয়। একটি প্রত্যায়নপত্রে চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া বাগেরহাট-৪ আসনের এমপি মোজাম্মেল হকের প্রত্যায়নপত্রে বরাত দিয়ে প্রশ্ন করা হয়- হেলালী রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধী হওয়ার পরেও সে কি করে ওলামা লীগের সভাপতি হয়?
প্রত্যয়নপত্রে আরও বলা হয়, স্থানীয় হোগলাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াসিন সিকদার তার স্বাক্ষরিত এক অভিযোগ পত্রে বলেছেন, হেলালী রাজাকার, তার পিতা ও চাচা এলাকার কুখ্যাত রাজাকার। হেলালীর ভাই আবু সালেহ হেলালী মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশ্যে গুলি করে তার (ইয়াসিন সিকদার) ভাই হাশিম সিকদারকে হত্যা করেছে। হেলালীর ভাই আবু সালেহ হেলালী ৮ নং যুদ্ধাপরাধী মামলার আসামী।
শুধু তাই নয় প্রত্যয়নপত্রে হেলালীর দাদা শান্তিকমিটির সদস্য ছিলেন বলেও দাবি করা হয়। পার্শ্ববর্তী এলাকা বড় হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্জ সরোয়ার হুসাইন তার স্বাক্ষরিত এক পত্রে হেলালীকে রাজাকার এবং লুটপাটকারী বলে প্রত্যায়ন করেছেন।
বুখারী ও শরীয়তপুরীর নেতৃত্বাধীন ওলামা লীগের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, উল্লেখিত বক্তব্য থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, হেলালীর নেতৃত্বাধীন ওলামা লীগ স্বঘোষিত। প্রকৃত ওলামা লীগ হচ্ছে- বুখারী ও শরীয়তপুরীর নেতৃত্বাধীন ওলামা লীগ।
নেতৃবৃন্দ বলেন, আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিলো তখন সকল আন্দোলন-সংগ্রাম এবং হরতালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশে তারাই মাঠে ও রাজপথে থেকে আন্দোলন করেছে।
তারা আরও দাবি করেন, ৯৬ সালে চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসলে রাসেল স্কোয়ারে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মোঃ নাসিমকে যখন জোট সরকারের লেলীয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনী হামলা চালিয়েছিল তখন বুখারী ও শরীয়তপুরীর নেতৃত্বাধীন নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে রেখে পুলিশের লাঠিপেটা থেকে রক্ষা করেছে।
বর্তমান নৌ-পরিবহন মন্ত্রী মোঃ শাহজাহানকে পুলিশ বেষ্টনি দিয়ে যখন আক্রমণ চালিয়েছিল তখন ওলামা লীগ তাকে রক্ষা করতে গিয়ে ওলামা লীগের নেতা হাজী আব্দুজ জব্বার ও হাফিজ আব্দুস সাত্তারকে চার দলীয় জোট সরকারের পুলিশ বাহিনী বেদম প্রহার করে রক্তাত্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রাখে।
হাওয়া ভবন ঘেরাওয়ের দিন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি রাতে বুখারী ও শরীয়তপুরীকে ডেকে নিয়ে পল্টন ময়দানে হাওয়া ভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচিকে বাস্তবায়ন করার জন্য বলেন। তিনি বলেন, আপনাদের সাথে নেতৃত্ব দিবেন তৎকালীন এমপি আহসানউল্লাহ মাস্টার ও কৃষক লীগের সভাপতি আব্দুল জলীল।
উল্লেখ্য যে, হেলালী এবং কাচপুরী সেই সময় হাওয়া ভবনে বসে বার বার পুলিশের নিকট টেলিফোনের মাধ্যমে খবর দিচ্ছে ওলামা লীগের একজন নেতা কর্মীকেও হাত, পা না ভেঙ্গে ছেড়ে দিবেন না।
ইআর, কেবি





