নারায়নগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সেভেন মার্ডার মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনের গ্রেপ্তার নিয়ে দুই মন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর এমন বিপরীতমুখী বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নূর হোসেনের বিচারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।
আজ (সোমবার) রাজধানীর জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে জাতীয় ফল প্রদর্শনীর উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন নূর হোসেনের ভারতে গ্রেপ্তার হওয়ার ব্যাপারে সরকার কিছুই জানে না। সরকার যেটুকু জেনেছে, তা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছে।
অথচ মাত্র একদিন আগে রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ভারতের কলকাতায় নূর হোসেনের গ্রেপ্তার বিষয়ে আপনারা যা জেনেছেন তা শতভাগ সত্যি। তবে, আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় আছি।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, বলতে গেলে বাংলাদেশের চারদিকেই ভারত। তাই যে কেউ যেকোনভাবে ভারত পালিয়ে যেতে পারে। নূর পালিয়ে যাবার পরই আমরা ধরে নিয়েছিলাম সে ভারতেই পালিয়েছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব তাকে ফেরত আনা হবে।
এমনকি নূর হোসেন কার সহায়তায়, কখন, কিভাবে ভারতে পালিয়ে গিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। নূরের সহায়তায় আরও যার যার নাম বেরিয়ে আসবে তাদেরও বিচার করা হবে বলেও সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট করেন তিনি।
এছাড়া গতকাল (রোববার) সকালে গণমাধ্যমকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, কলকাতা পুলিশের সংশ্লিষ্ট শাখার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন। তাঁকে দেশে আনার আইনগত প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে।
এছাড়া বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে দেশের প্রায় সব এবং ভারতের বেশ কিছু গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, কলকাতায় গ্রেপ্তার হওয়া নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন এবং তাঁর দুই সহযোগীর আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রোববার স্থানীয় সময় দুপুর দুইটার দিকে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সদর বারাসাতের দ্বিতীয় মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম এ আদেশ দেন।

খবরে আরও বলা হয়, স্থানীয় সময় রোববার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে নূর হোসেন ও তাঁর দুই সহযোগীকে নিয়ে বাগুইয়াটি থানা থেকে আদালতের উদ্দেশে রওনা হয় পুলিশ। এরপর ওই তিনজনকে আদালতের গারদখানায় রাখা হয়। শুনানি শেষে তিনজনের প্রত্যেকের আট দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। নূর হোসেন ও তাঁর দুই সহযোগীর পক্ষে আদালতে জামিনের আবেদন করা হয়নি।
কলকাতার পুলিশ সূত্র আরও জানায়, কলকাতায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বিমানবন্দর-সংলগ্ন বাগুইয়াটি থানা এলাকার কৈখালির ইন্দ্রপ্রস্থ আবাসনের চারতলা থেকে গতকাল শনিবার রাত নয়টার দিকে নূর হোসেন ও তাঁর দুজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে কিছু টাকা ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছে ভারতে আসার কোনো বৈধ কাগজপত্র বা পাসপোর্ট পায়নি পুলিশ। অনুপ্রবেশ, অস্ত্র আইন ও জুয়ার আসর বসানোর অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে বাগুইয়াটি থানার পুলিশ।

খবরে আরও প্রকাশ কলকাতার বাগুইয়াটি থানা এলাকার কৈখালির ইন্দ্রপ্রস্থ আবাসন ভবনে লুকিয়ে ছিলেন নূর হোসেন। মুখার্জি পুলিশের বরাতে কলকাতার বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, আগে থেকেই পুলিশের নজরে ছিলেন নূর হোসেন। গতকাল রাতে পুলিশ জানতে পারে, কৈখালির একটি আবাসনে নূর হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা জুয়ার আসর বসিয়েছেন। এরপর কলকাতা পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াডের (এটিএস) সদস্যরা বাগুইয়াটি থানার পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া নূর হোসেন ও তাঁর দুই সহযোগী কলকাতায় চিকিৎসার নাম করে কৈখালির ওই আবাসনের চারতলার ঘর ভাড়া করেছিলেন।
তবে, গণমাধ্যমের এত খবর এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পুলিশের বক্তব্যের পরও নূর হোসেনের ভারতে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গে সোমবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কেন বললেন যে এ বিষয়ে সরকার কিছু জানে না-তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দেশের মানুষ।
মন্ত্রীদের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতার প্রকাশ পেয়েছে বলেও মন্তব্য তাদের। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অনেকের মনেই- শেষ পর্যন্ত কুখ্যাত খুনি নূরের বিচার হবে তো?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এ এস এম আতীকুর রহমান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বাংলাদেশের জন্য এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় যে, দেশের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন চলছে। এর পেছনে বড় দুএকটি রাজনৈতিক দলের কতিপয় দুর্বৃত্ত দায়ী। এসব দুর্বৃত্তদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়া রাজনীতিকে মুক্ত করতে হবে।
তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর উল্লেখ করে এ ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পদক্ষেপ নেয়ারও আহবান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক শাহীদুজ্জামানের কাছে এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে এত আলোচনা, দেশ-বিদেশী গণমাধ্যমে এত খবর প্রকাশের পরও সরকার বিষয়টি জানেনা এমন বক্তব্য বিস্ময়কর। সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আরও সমন্বয় দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, শুরু থেকেই সরকারের কিছু মন্ত্রী এভাবে এক একটি সেনসিটিভ ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তদারকি হওয়া দরকার।

উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল তাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে। পরের দিন ২৮ এপ্রিল নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ফতুল্লা মডেল থানায় নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন।
আলোচিত এই খুনের ঘটনায় ইতোমধ্যেই র্যাবের চাকরিচ্যুত তিনজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আরিফ হোসেন ও এম এম রানা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন যে নূর হোসেনের পরিকল্পনায় এ সাত খুনের ঘটনা ঘটে।
এছাড়া কামাল নামের এক ব্যক্তিও রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। এতে তিনি স্বীকার করেন নূর হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর ভারতে পালিয়ে যান। এদিকে, নারায়নগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনের একটি ফোনালাপের অডিও প্রকাশ পায়।
ঢাকা, ১৬ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি





