বিতর্কিত মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর কটূক্তিপূর্ণ বক্তব্যে ইস্যু পেয়ে গেল ইসলামি দলগুলো। কওমি মাদরাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম চার ধারায় বিভক্ত থাকলেও এই ইস্যুতে এক মঞ্চে এসেছে। লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিপরিষদ থেকে অপসারণ, দল থেকে বহিষ্কার এবং তার শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ইসলামি দলগুলো।

সাধারণত ইস্যুকেন্দ্রিক আন্দোলনে সরব থাকে ইসলামি দলগুলো। অনেক দিন যাবত কোনো ইস্যু না থাকায় নেথিয়ে পড়েছিল ধর্মভিত্তিক দলগুলো। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবিতে সব ইসলামি দল ও কওমি মাদরাসাগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করেছিল। বিভিন্ন কারণে তাদের সে ঐক্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বক্তব্য দেয়ায় সবাই এবার এক হয়েছেন। ইসলামি দলগুলো পৃথক কর্মসূচি দিলেও ভেতরে ভেতরে তাদের মধ্যে একটি যোগাযোগ আছে বলে জানা গেছে। প্রযোজনে সব বিভেদ ভুলে তারা আবার এক মঞ্চে আসতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে।

লতিফ সিদ্দিকীর এ বক্তব্য মিডিয়ায় আসার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের দাবিতে সর্বপ্রথম হেফাজতে ইসলাম ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়। প্রতিবাদ জানায় দেশের সব ইসলামি দল। এরপর একে একে সবাই তার অপসারণ, বহিষ্কার ও শাস্তির দাবিতে শুক্রবার রাজধানী ও শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

ইসলামি দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য, শুধু মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ, দল থেকে বহিষ্কার করলেই হবে না, তাকে গ্রেফতার করতে হবে এবং কঠোর শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। যদি সরকার তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তারা রাজপথে নামবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

তারা বলেন, “ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম একটি পবিত্র হজ। পাঁচটির যেকোনো একটি অস্বীকার করলে সে মুসলমান থাকেন না। নিউ ইয়র্কে প্রবাসীদের এক অনুষ্ঠানে এই স্তম্ভটি নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন লতিফ সিদ্দিকী। এই স্তম্ভটি অস্বীকার করায় তিনি আর মুসলমান নন, তাকে আবার তওবা করে ইসলামে প্রবেশ করতে হবে।”

এদিকে লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণ, বহিষ্কার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে জামায়াতে ইসলামী বুধবার সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ওই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সফল করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সব শাখা ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “পবিত্র হজ ও হজরত মুহাম্মদ সা. এবং তাবলিগ জামায়াত সম্পর্কে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর অন্যায়, অসংযত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য রেখে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের মুসলমানদের অন্তরে মর্মান্তিক আঘাত হেনেছেন। তিনি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে গুরুতর অপরাধ করেছেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অপরাধে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।”

একই দাবিতে বুধবার ঢাকায় ও শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম, চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোটসহ আরো বেশ কয়েকটি ইসলামি দল।

এদিকে মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সম্মিলিতি ওলামা-মাশায়েখ পরিষদ সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে। বেধে দেয়া সময়ের মধ্যে লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হরতাল- অবরোধের কর্মসূচি দেবে তারা।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রধান আমির মাওলানা শাহ্ আহমাদুল্লাহ আশরাফ বলেন, “আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা., ইসলামের ফরজ ইবাদত পবিত্র হজ এবং মহান ধর্ম প্রচারের দাওয়াতি কাফেলা তাবলিগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমার বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। যা জনসমর্থনহীন বিনা ভোটে নির্বাচিত অগণতান্ত্রিক জবরদখলকারী আওয়ামী মহাজোট সরকারের দ্বীন, ধর্ম, দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে কুদৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।”

তিনি বলেন, “লতিফ সিদ্দিকী তার বক্তব্যের দ্বারা নিজেই নিজেকে মুরতাদ ঘোষণা করেছেন। এ ধরনের আত্মস্বীকৃত মুরতাদদের রাষ্ট্রদ্রোহীদের মতো মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।” অবিলম্বে তাকে গ্রেফতার করে শাস্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, অন্যথায় জনগণ সরকারকে অচল করে দেবো।

সৌদি আরবে অবস্থানরত হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী এক বিবৃতিতে বলেন, “লতিফ সিদ্দিকী ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ পবিত্র হজকে কটাক্ষ করায় মুরতাদ হয়ে গেছে। ইসলামে মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। হেফাজতে ইসলাম যে ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন হলে লতিফ সিদ্দিকী এতবড় ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস পেতেন না।”

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মাওলানা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, “সরকারের ইঙ্গিতে ইসলামবিরোধীদের এত বড় আস্ফালন। তাদের সীমা ছাড়িয়ে এখন মন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছেছে।”

তিনি সাবধান করে বলেন, “বাড়াবাড়ি করবেন না। ইসলাম রক্ষায় প্রকৃত মুসলমানরা জীবন দিতে প্রস্তুত। দেশে ইসলামবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের উচিত শিক্ষা দেয়া হবে।”

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, “এটি প্রাথমিক কর্মসূচি। লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দেশে দাবানল জ্বলে উঠবে। দেশের তৌহিদী জনতার দুর্বার আন্দোলনে ইসলামবিদ্বেষী সরকারের মসনদ ভেঙে দেবে।”

সূত্র: নতুন বার্তা

জেএ