বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ২০ দলের চলমান অবরোধ ও হরতাল এখন গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। জনগণের তীব্র প্রতিরোধের মুখে সরকার এখন পাগলপ্রায়।
আজ সোমবার এক বিবৃতির মাধ্যমে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, একের পর এক গুপ্তহত্যা, গুম, মামলা, গ্রেফতার করেও বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়ে এখন সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
রোববার রাতে রাজধানীর আদাবর থেকে মহিউদ্দিন, ইমাম হোসেন ও আসাদকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া রোববার সন্ধ্যায় লালবাগ থেকে জামায়াত নেতা আল আমিন, ঢাকা মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার ছাত্র ও ছাত্র নেতা তারেক ও জহিরুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
আজ সকালে ডেমরার কলোনী এলাকা থেকে ২ জামায়াত নেতা গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাছাড়া বিরোধী নেতা-কর্মীদের পরিবার-পরিজনেরাও নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে আটক বিশিষ্ট সাংবাদিক মাসুদ মোস্তফার স্ত্রীকেও গত রাতে বাসা থেকে বিনা ওয়ারেন্টে আটক করেছে পুলিশ। যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
আটকের ২৪ ঘন্টার মধ্যে আদালতে হাজির করানোর নিয়ম থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের হদিস পাওয়া যাচ্ছেনা। পল্টন থেকে মিছিলের আগ মুহূর্তে ইসলামী ছাত্রশিবিরের থানা সভাপতি রাসেল আমিনকে ধরে নিয়ে গেছে সাদা পোষাকের পুলিশ। আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের নির্মমতায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যত্রতত্র লাশ পাওয়া যাচ্ছে যা পাকিস্তানী হানাদার বিহিনীর আক্রমনকে মনে করিয়ে দেয়।
আজও পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে রাজধানীতি দুইজন নিহত হয়েছে। সোমবার ভোর রাতে যাত্রাবাড়ী থানাধীন মাতুয়াইল মাদ্রাসা বাজার এলাকায় ডিবি পুলিশের গুলিতে অজ্ঞাত এক যুবক নিহত হয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে ওই একই এলাকায় র্যাবের গুলিতে আরো দুই যুবক নিহত হয়। এছাড়া মঙ্গলবার গভীর রাতে কাঠেরপুল এলাকায় র্যাবের গুলিতে আরো দুই যুবক নিহত হয়।
এদিকে ক্যান্টনমেন্ট থানার কালশী ইসিবি চত্বর থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের মাথাসহ শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা কলেজের ছাত্রশিবির নেতা আবুল হাসানকে শনিবার আটক করা হলেও এখনো তাকে কোর্টে হাজির না করায় তার জীবননাশের আশঙ্কা প্রকাশ করেন মহানগরী আমীর।
সেই সঙ্গে বাসা-বাড়ি এবং রাস্তা থেকে আটক করার পর এখনো যেসব নেতা-কর্মীদের কোর্টে হাজির করা হয়নি অবিলম্বে তাদের জনসম্মুখে হাজির করার দাবী জানান তিনি।
বিবৃতিতে গণমাধ্যমের উপর কঠোর সেন্সরশিপের নিন্দা জানিয়ে জামায়াত নেতা বলেন, সরকার বিরোধীমতের পত্রিকা ও টেলিভিশন বন্ধ করার পর এখন সরকার সর্মথক টেলিভিশনেরও বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচারে বাধা দিচ্ছে। বিশিষ্ট নাগরিকদের বক্তব্যে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ হওয়ায় বাংলাভিশনে সাংবাদিক মতিউর রহমানের সঞ্চালনায় টকশো ফ্রন্টলাইন প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে।
জনরোশের বহি:প্রকাশ রোধে অতীতেও আওয়ামী সরকার তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রিত শুধু চারটি পত্রিকা ছাড়া সকল পত্র-পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু এতেও তাদের শেষ রক্ষা হয়নি এবারও শেষ রক্ষা হবে না।
মহানগরী আমীর বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিয়োজিত দলবাজ কিছু কর্মকর্তার জন্য আজ দেশে-বিদেশে এসব বাহিনীর সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। জনগণের নিরাপত্তা বিধানের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে খুনী বাহিনী হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে।
বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে র্যাবের ডিজি, পুলিশের আইজিপি, বিজিবির মহাপরিচালকের একের পর এক উষ্কানীমূলক বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডকে আরো উৎসাহিত করছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেখা মাত্র গুলির নির্দেশনার পরেই কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে বিরোধী নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণকে একের পর এক হত্যা করা হচ্ছে। কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিরোধী নেতাকর্মীসহ প্রায় অর্ধশাতধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
জাতিসংঘসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ব্যপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও এ বিষয়ে তারা নির্বিকার। তিনি প্রশাসনের এসব উতি-উৎসাহী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের রাজনৈতিক বক্তব্যই আপনাদের পরিচয় জনগণের সামনে উম্মোচিত করে দিয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের এধরণের রাজনৈতিক বক্তব্য মানায় না।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে পরিকল্পিত ভাবে বাসে পেট্রোল বোমা মেরে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ অফিস থেকে ১০টি পেট্রোল বোমা উদ্ধার, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে পেট্রোল বোমাসহ দুই যুবলীগ কর্মী, রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে থেকে পেট্রোল বোমাসহ দুই আওয়ামী লীগ কর্মীসহ বিভিন্ন স্থানে নাশকতাকারী সরকারদলীয় কর্মীদের আটক করলেও কোন মামলা না দিয়ে উপরমহলের চাপে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
এই কাজগুলোর মাধ্যমে এটাই প্রমাণ হয় যে, সরকারদলীয় এজেন্টরাই সারাদেশে পেট্রোল বোমা হামলার মাধ্যমে মানুষ হত্যা করছে। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলনকে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রসবাদ বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দেশে-বিদেশে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমরা দেশবাসীকে সরকারের এই ঘৃণ্য চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানাচ্ছি।
মহানগরী আমীর বলেন, সরকারের তীব্র বাঁধা, জুলুম-নির্যাতন, গণগ্রেফতার সত্ত্বেও আজ রাজধানীর রমনা, মগবাজার, নয়াপল্টন, মধুবাগ, পল্টন, মতিঝিল, উত্তরা, মহাখালি, মৌচাক, তেজগাঁও, যাত্রাবাড়ি, সবুজবাগ, শনির আখড়া, কদমতলী, ডেমরা, কাজলা, কোতয়ালীসহ বিভিন্ন থানা ও এলাকায় অবরোধ সমর্থনে জামায়াতের কর্মীরা মিছিল, পিকেটিং ও রাজপথ অবরোধ করে।
সরকার পতনের চূড়ান্ত মুহূর্তে আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল, সাংবাদিক, শিক্ষক-ছাত্র, আইনজীবী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারক ও ব্যাংক-বীমার কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সকল পেশা ও শ্রেণীর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসার আহবান জানান।
এছাড়া অবৈধ সরকার পতনের দাবীতে ২০ দলের আহবানে চলমান অবরোধ এবং ৭২ ঘন্টা লাগাতার হরতালের ২য় দিন প্রতিটি কর্মসূচীতে সর্বাত্মক অংশগ্রহণের জন্য ঢাকা মহানগরবাসীকে অভিনন্দন জানান মহানগরী আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।
সেই সঙ্গে গনতন্ত্র ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অংশ হিসাবে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত দেশব্যাপী অবরোধসহ সর্বাত্মক হরতাল সফল করতে রাজধানীর সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে মাঠে নেমে আসার আহবান জানান তিনি।
এসএইচ





