বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া বাংলার মাটিতে আগামী দিনে কোনও নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না বলে সরকারের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দলটির সিনিয়র নেতারা।
খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে সিলেট বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, “ক্ষমতাসীন সরকার ভেবেছিল বেগম খালেদা জিয়াকে জেলখানায় বন্দি রেখে বিএনপিকে দুর্বল করা যাবে। কিন্তু তাদের সেই আশা ব্যুমেরাং হয়েছে। আমরা খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেই দেশে আবারও গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করবো।”
তিনি সরকারকে অবিলম্বে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়ে বলেন, “আমাদের ‘এক দফা এক দাবি, স্বৈরাচার তুই কবে যাবি?’‘এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি?’‘শেখ হাসিনার সময় শেষ, খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ’।”
মঙ্গলবার (১০ এপ্রিল) বিকেলে সিলেট জেলা রেজিস্ট্রার মাঠে খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সিলেট বিভাগীয় সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
দলের নেতাকর্মীদের আগামী দিনে আন্দোলনের জন্য আবারও প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে মোশাররফ বলেন, “শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে এবং তাঁর নেতৃত্বেই বিএনপি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।”
সরকার ফের একদলীয় নির্বাচন করতে চায় মন্তব্য করে ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, “সরকার বিএনপি এবং বেগম খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে আবারও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা নির্বাচনের ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু ওই নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সুতরাং বর্তমান সরকার অনির্বাচিত এবং সংসদ অবৈধ। কেননা এই সরকার ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে নিয়ম ও সংবিধান রক্ষার নির্বাচন বলে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। বিদেশী বন্ধুদের সাথেও প্রতারণা করেছে। এজন্যই সরকার জনগণকে ভয় পায়। কিন্তু জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগের পাত্তা থাকবে না। তাদেরকে জনগণ বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করবে।”
সাবেক এই মন্ত্রী আরও বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া আজকে দেশনেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী উপাধি পেয়েছেন। আজকে তাঁকে নিয়ে শুধু দেশবাসী নয় বিশ্ব নেতৃবৃন্দও উদ্বিগ্ন। তিনি আজকে দেশনেত্রী থেকে দেশমাতা উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।”
দলের নেতৃত্ব প্রসঙ্গে ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, “বিএনপি দুর্বল হয়নি। বরং আমরা নেতৃবৃন্দ আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শ ও নির্দেশে আমরা দল পরিচালনা করছি।”
তিনি বলেন, “সরকার বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও প্রশাসনকে ধ্বংস করে ফেলেছে। এই সরকার গুম, খুন, অপহরণ এবং টাকা লুট করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বৈরাচারের স্বীকৃতি পেয়েছে।”
সিলেটের কৃতি সন্তান বিএনপি নেতা নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলী প্রসঙ্গে ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, “আজ পর্যন্ত ইলিয়াস আলীর সন্ধান নেই।”
কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গে বিএনপির শীর্ষ এই নেতা বলেন, “আজকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালানো হচ্ছে। দেশকে মেধাশূন্য করা হচ্ছে। আসলে কোটা সংস্কার আন্দোলন যৌক্তিক। এ বিষয়টি আমাদের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুই বছর আগে ‘ভিশন-২০৩০’তে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন।”
উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, “এই সরকার বরাবরাই আমদের কর্মসূচিতে বাধা দিচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তায় ভয় পায় বলে তাঁকে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। বেগম খালেদা জিয়াকে পিজি হাসপাতালে আনা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসার নাম করে দেশনেত্রীকে হয়রানি করা হয়েছে। তাঁর বিন্দুমাত্র মনোবল ভাঙেনি। ম্যাডাম খালেদা জিয়া বলেছেন, গণতন্ত্র উদ্ধার করতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে।”
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, “স্বৈরাচার আর গণতন্ত্র একসাথে চলতে পারে না। বর্তমান স্বৈরচারি সরকার যত গুম-খুন, দুর্নীতি করেছে তার জবাব সমুচিত দিতে হবে। তারা এত অপরাধ করেছে যে এখন ভয়ে কম্পমান। শেখ হাসিনা ও এই সরকারের অত্যাচার হিটলারকেও ছাড়িয়ে গেছে। স্বৈরাচার বেশিদিন টিকতে পারে নাই। এরাও পারবে না। এদর পতন ঘটিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আবারও গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বন্দি মানে গণতন্ত্র বন্দি। আমরা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। আইনিভাবে তিনি মুক্তি পেলে দুই মাস আগেই মুক্তি পেতেন। তাঁকে মুক্তি করতে হলে যারা তাঁকে বন্দি করে রেখেছে তাদের পতন ঘটাতে হবে। তবে আমাদের শান্তির বাণী অশান্তির নেত্রীর (শেখ হাসিনা) কাছে পৌঁছাবে না। যারা অন্যায়ভাবে আমাদের ওপর নির্যাতন গুম-খুন ও দুর্নীতি করছে, ব্যাংক ডাকাতি করে তাদেরকে হঠাতে হবে। এরশাদের যেভাবে পতন ঘটানো হয়েছিল শেখ হাসিনাকে হটাতে সে পথে যেতে হবে। অন্যথায় গণতন্ত্র মুক্তি পাবে না।”
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ”অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন ৪ হাজার কোটি টাকা কোনও ব্যাপারই না। অথচ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দুই কোটি টাকার মিথ্যা দুর্নীতি মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘এই বিশাল জনসতা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আন্দোলিত করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এই সরকারের ভিত্তি নাই। তারা অবৈধ পন্থায় সরকার গঠন করেছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র যেভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তেমনি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে হারানো গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবো।”
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ”আওয়ামী লীগকে বলবো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাদ দিয়ে রাজপথে আসুন, আমরা আপনাদের রাজপথে মোকাবিলা করবো। আজকের শপথ হউক- ‘বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকবো’।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ”গণতন্ত্রের মা’কে আজকে সরকার বন্দি করে রেখেছে। গণতন্ত্রের মা কি কারাগারে থাকতে পারে? গণতন্ত্র সাগরের মতো, সাগরকে কেউ বাঁধ দিয়ে আটকে রাখতে পারে না। সাগর আজকে জেগে উঠেছে। সাগরের এই পানি দুর্নীতিবাজ আর খুনিদের ভাসিয়ে দেবে।”
বিএনপিকে সভা সমাবেশ করার অনুমতি না দেয়ায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করে আমির খসর বলেন, ”সিলেটবাসী এখানে কেন সমাবেশ করবে, বিএনপির সমাবেশ আরও বড় জায়গায় হওয়ার কথা ছিল। সিলেটে এসে শুনলাম রেজিস্ট্রার মাঠেও নাকি অনুমতি দেয়া হয়নি। আপনারা সিলেটবাসী ঐক্যবদ্ধ আছেন বলে তারা সমাবেশ করতে দিতে বাধ্য হয়েছে। সভা সমাবেশ করা আমাদের রাজনৈতিক অধিকার, কারও দয়ার উপর এটা নির্ভর করে না। সংবিধান আমাদেরকে এ অধিকার দিয়েছে।”
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেনের সভাপতিত্বে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান সেলিম ও সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ ছাড়াও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, মো. শাহজাহান, বরকত উল্লাহ বুলু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক, ফজলুল হক আসপিয়া, এনামুল হক চৌধুরী, খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, ক্ষুদ্রঋন বিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, দিলদার হেসেন সেলিম, কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন, সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য শাম্মী আক্তার, এম নাসের রহমান, আলহাজ্ব সুফিয়ান, নাসির উদ্দিন চৌধুরী, মিজানুর রহমান চৌধুরী,অ্যাডভোকেট হাদিয়া চৌধুরী মুন্নি, জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট এম নুরুল হক , সিলেট মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি কায়সার আহমেদ ঝন্টু, সিলেট জেলা বিএনপির সহ সভাপতি আব্দুল গফফার , সুনামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম, মৌলভী বাজার উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জিকে গউজ, যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি মোরতাজুল করিম বাদরু, জাসাসের সাধারণ সম্পাদক হেলাল খান, ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার, সিলেট মহানগর মহিলা দলের ভারপ্রাপ্ত সভানেত্রী মিনারা বেগম, জেলা মহিলা দলের সভানেত্রী সালেহা কবির সেপী, সিলেট জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সাঈদ আহমেদ, সিলেট মহানগর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইউনুছ মিয়া প্রমুখ।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এ হক, সাবেক সংসদ সদস্য আবুল খায়ের চৌধুরী, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের শামীম, জেলা বিএনপির সদস্য এটিএম বেলায়েত হোসেন মোহন, বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দিদার, অ্যাডবোকেট আবেদ রাজা, যুবদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসান, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম সাজু, সিলেট জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরী, সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস মুন্না, যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি কাউয়ুম চৌধুরী, ছাত্রদল নেতা ইকবাল হোসেন আসিফ, আরাফাত রহমান কোকো স্পোটিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ আহমেদ প্রমুখ।
সমাবেশে বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের লক্ষাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সমাবেশ ঘিরে মঙ্গলবার সকাল থেকেই ব্যানার, ফ্যাস্টুন ও বিভিন্ন শ্লোগান নিয়ে নগরীর রেজিস্ট্রারি মাঠে সমাবেশস্থলে দলে দলে জড়ো হতে থাকে দলের নেতাকর্মীরা। হাজার হাজার নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে রেজিস্ট্রারি মাঠ এলাকা। মাঠ ছোট হওয়ায় নেতাকর্মীরা রাস্তায় অবস্থান নেন। মিছিল নিয়ে আসা নেতাকর্মীরা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকেন। দুপুর গড়ানোর আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে রেজিস্ট্রারি মাঠ। খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে শ্লোগানে শ্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে গোটা নগরী।
এমবি





