বিএনপি তার ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল শেষ করেছে। দলটি ইতোমধ্যে মহাসচিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও কোষাধ্যক্ষের নাম ঘোষণা করেছে। আশা করা যায়, চলতি মাসের মধ্যেই দলের স্থায়ী কমিটিসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বাকী কর্মকর্তা ও সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হবে। এরপরই জনগণের মধ্যে যে মিলিয়ণ ডলারের প্রশ্নটি জাগরুক হয়, তা হচ্ছে বিএনপি রাজপথের কোন কর্মসুচি দেবে কিনা?

এমন একটি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল দলের একজন গুরুত্বপুর্ন নেতার কাছে। শুক্রবারে এক অনুষ্ঠান শেষে প্রেস ক্লাবের মেম্বারস লাইঞ্জে আড্ডা দেয়ার সময় এ প্রশ্নটি উত্থাপন করা হয়েছিল। বিএনপির এই নেতা সকলের কাছেই পরিচিত, তাই তার নামটি এ লেখায় উহ্য রাখা হলো।  

নেতাটি মুচকি হাসলেন, কিন্তু প্রশ্নের কোন উত্তর সরাসরি দিলেন না। ঘুরিয়ে- পেঁচিয়ে যা বললেন, তার সারাংশ করলে এই দাঁড়ায় যে, রাজপথের আন্দোলনে বিএনপি আসলে সহসাই যাচ্ছে না। এখন অবশ্য এমন অবস্থাও নেই দলটির। তাদের পুরো মনোযোগ এখন দলকে গণভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর দিকেই।

আর এখন তাদের অগ্রাধিকার (প্রায়োরিটি) হচ্ছে : নেতাকর্মীদের মনে ভয়ভীতি দূর করে আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিগত দুটি আন্দোলনে অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের ও এ নির্বাচনের দিনকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস আখ্যায়িত করে এক বছর পরের আন্দোলনে বিএনপি নেতাকর্র্মীরা ব্যাপক মামলা-হামলা, গুম ও হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে।

দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার সারা দেশে দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২১ হাজার ৬৮০টি মামলা দিয়েছে। এতে আসামির সংখ্যা ৪ লাখ ৩ হাজার ৮৭৮ জন। এর মধ্যে খালেদা জিয়াসহ কেন্দ্রীয়সহ ১৫৮ জন নেতার বিরুদ্ধে আছে ৪ হাজার ৩৩১ মামলা।

আর দলের স্থায়ী কমিটির ১২ জন সদস্যের বিরুদ্ধেই আছে ২৮৮টি মামলা। এ ছাড়া সারা দেশে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেলে আছেন ১৭ হাজার ৮৮৫ জন নেতা-কর্মী। এ হিসাব গত বছরের ২ আগস্ট পর্যন্ত। আরও নতুন মামলা হচ্ছেই।

আর যারা মামলার বাইরে রয়েছেন তারা বাসায় ঘুমোতে পারেন না। এলাকায় থাকতে পারেন না। তাদের থাকা-খাওয়া এবং সর্বোপরি রাতে ঘুমানোর জায়গায় কোন নির্দিষ্ট স্থান থাকে না। বলা হয়, “যেখানে রাইত, সেখানেই কাইত”। বিএনপির নেতাকর্মীরা এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছে।

বিএনপির ওই নেতা জানান, এখন দলের নেতাকর্মীদের সকাল শুরু হয় আদালতে মামলায় হাজিরা দিয়ে এবং মামলা নিয়ে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ পর রাতে ঘুমোতে যেতে হয়। আন্দোলন নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে, তাই, ভয়ভীতি কাজ করছে। সম্প্রতি শেষ হয়ে যাওয়া কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীরা আস্তে আস্তে জনসম্মুকে আসতে শুরু করেছেন।

রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছেন মাত্র। অবশ্য গত বছরের ২৮ এপ্রিল চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের অংশগ্রহণের মধ্যদিয়েই এ কাজ শুরু হয়েছিল। এখন চলছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এতেও বিএনপিসহ সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা অংশ নিয়েছেন, যদিও সরকারি দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনকে একটি উপহাসে পরিণত করেছে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা এ নির্বাচনকে কোনভাবেই সুষ্টু নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করতে চান না। তবু বিএনপি এসব মাধ্যমকে ইতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে দেখতে চায় এই কারণে যে, এসবের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারছে, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হতে পারছে এবং নিজেদের মধ্যে আস্থা ফিরে পাচ্ছে।

এছাড়া সারাদেশে দল পুনর্গঠনের কাজ চলছে। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠন চলছে, এতেও নতুন অনেক নেতাকর্মী স্থাপন পাবে। এছাড়া ২৫টি যে বিশেষ কমিটি করা হবে তাতেও প্রচুর নেতাকর্মীর সংকুলান করা হবে। এতে দলের ‘নতুন মুখ’ সংযোজিত হবে। এভাবে দল যেমন গতিশীল হবে, তেমনি নেতাকর্মীরা প্রাণিত হবেন। এভাবে দল ও নেতাকর্মীরা যখন প্রণোদিত হবেন, তখন না হয় রাজপথের আন্দোলনের কথা চিন্তা করা যাবে বলে ওই নেতার কথা থেকে বুঝা যায়।

তবে আন্দোলন নিয়ে তার মত হচ্ছে, রাজপথে মিছিল-মিটিং করলেই যে আন্দোলন হবে এবং সরকারের পতন হবে-তা তিনি মনে করেন না। রাজপথে মিছিল-মিটিং করা আন্দোলনের একটা দিক। বাংলাদেশের আন্দোলনের ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে দেখা যায়, শুধু রাজপথের আন্দোলন দিয়ে কোন সময়েই সরকারের পতন ত্বরান্বিত করা যায়নি। তিনি মনে করেন, আন্দোলনের পাশাপাশি সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের সমর্থনটা প্রয়োজন। বিদেশিদের সহযোগিতা তারপরে।

তিনি উদারহণ দিয়ে বলেন, ’৮৭ সালে সারাদেশে এত বড় আন্দোলনের পরও এরশাদের পতন হয়নি। ’৯০ সালে যখন সামরিক বাহিনী এরশাদকে আর সমর্থন না দেয়ার কথা বলে এবং বেসামরিক প্রশাসন সহযোগিতা দিতে অস্বীকার করে, কেবল তখনই এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এর আগে নয়। এ বিষয়গুলো দেখতে হবে। বিএনপির ওই নেতা বলেন, এটা আমার ব্যক্তিগত মত। এর সঙ্গে দলের মতামতের কোন মিল নেই। ( বাছির জামাল )

এমবি