বাংলাদেশে রাজনৈতিক মদদে সৃষ্ট সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে যথেচ্ছা গুম ও আটক বন্ধ হওয়ার কোন লক্ষণই যেন আপাতদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় দেশের সব স্তরের নাগরিকের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সময় শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫) এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

এতে বলা হয়, গত এক মাসে সহিংসতায় বাংলাদেশে নিহত হন ৬০ জন, আহত হন আরও কয়েকশ এবং সারাদেশে গ্রেফতার করা হয় কয়েক হাজার মানুষকে।

এই পরিস্থিতিতে সব দলের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সুস্পষ্টভাবে বলা উচিত তাদের দলের কোন সমর্থকের আইন বহির্ভূত কোন ধরনের সহিংসতায় জড়িত হওয়া উচিত নয়।

সংগঠনটির এশিয়া অঞ্চলের ডিরেক্টর ব্রাড অ্যাডামস বলেছেন, সব রাজনৈতিক দলকেই সহিংসতা বন্ধে এবং অপরাধীদের আটক করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে সহযোগিতা করা উচিত।

তবে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কিছু কিছু সদস্যের অপরাধের জবাবে সরকারের মদদে হত্যা, আহত এবং অন্যায় আটক কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতেই যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনকে গণতন্ত্রের বিজয় আখ্যায়িত করে তা পালনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন থেকেই সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক ধরপাকড় ও সহিংসতা শুরু করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার যেন পুরোনো বিশৃঙ্খলাকেই নতুন করে চালু করে এবং সরকারি বাহিনী গণহারে গ্রেফতার, হত্যা ও গুম শুরু করে।

প্রতিবেদনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর চলমান জ্বালাও-পোড়াও এবং সহিংস আন্দোলনকেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগের সহিংতার সাথে তুলনা করা হয়।

সংগঠনটির আগের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, এক বছর আগে ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠিত ওই সময়ের সহিংসতায় ৫শ'রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

বাংলাদেশের চলমান সহিংতার মধ্যে পেট্রোল বোমা হামলাকে সবচেয়ে ভয়ংকর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বিরোধী দলের অবরোধ বা হরতাল কর্মসূচি চলাকালে যানবাহনে বিশেষ করে সাধারণ যাত্রী পরিবহনে যেই ভয়াবহ পেট্রোল বোমা হামলার ঘটনা ঘটছে তা নজিরবিহীন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দিনমজুর বা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষই এসব হামলার শিকার হচ্ছেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ৬০জন যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে পেট্রোল বোমা হামলায় সাত ব্যক্তি নিহত হন এবং ওই হামলায় আহত হন আরও ১৬ জন। এতে বাসটি পুরোপুরি জ্বলে যায়।

এছাড়া গত ৫ ফেব্রুয়ারি বগুড়ায় একটি ট্রাকে চালানো পেট্রোল বোমা হামলায় ট্রাকটির ড্রাইভার ও একজন আরোহী নিহত হন।

গত ১৭ জানুয়ারি পেট্রোল বোমা হামলায় আহত একজন পুলিশ কর্মকর্তা গত ৫ ফেব্রুয়ারি নিহত হয়েছেন বলেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবাধিকার কর্মীদের হিসাব মতে, চলতি বছরের জানুয়ারির শুরু থেকে এ পর্যন্ত গত এক মাসে বিরোধী হাতে ৪১ ব্যক্তি নিহত হন যাদের বেশিরভাগই এ পেট্রোল বোমার মতো হামলায় অগ্নিদগ্ধ হন। এ সময়ে হামলায় আরও কয়েকশ আহত হন।

গণমাধ্যম কর্মীদের বরাত দিয়ে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিটে ধারন ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগি ভর্তি হয়েছে।

তবে, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) শীর্ষ নেত্রী এসব হামলার জন্য পরস্পরকে দায়ী করছেন এবং নিজ দলের সমর্থকদের নির্দোষ বলে দাবি করছেন।

উদাহরণ স্বরূপ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র নেত্রী বেগ খালেদা জিয়া এসব সহিংসতার জন্য আবারও পুরোপুরি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে দায়ী করেছেন। অথচ এ ধরনের হামলায় তার দলের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অপরদিকে, গত এক মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অন্তত ১৭ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন যাদের অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াত বা তাদের ছাত্র সংগঠনের সদস্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশ গতানুগতিক ব্যাখ্যা দেয় এই বলে যে, ক্রসফায়ার বা সন্ত্রাসীদের সাথে গোলাগুলির এক পর্যায়ে তারা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।

অথবা পুলিশ নিহতদের লাশ উদ্ধার করে বলছে তারা গোলাগুলিতে নিহত হয়েছেন অথচ এদের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার আগে থেকেই দাবি করা হয় গ্রেফতার হয়ে তারা পুলিশ হেফাজতে আছেন।

এসব ঘটনায় সরকার কোন ধরনের পদক্ষেপ তো নিচ্ছেই না; বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব বাড়াবাড়ির কোন ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত পর্যন্ত করছে না, দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো তো দূরের কথা।

এইচআরডব্লিউয়ের প্রতিবেদনে, পুলিশকে সহিংসতা বন্ধের নামে যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহনের অবাধ এখতিয়ার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন তারও সমালোচনা করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালাও-পোড়াও কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রধানমন্ত্রী এই এখতিয়ার দিয়েছেন-বাহ্যত এমন দাবি করা হলেও এর ফলে প্রকৃত অর্থে পুলিশকে আরও বাড়াবাড়ি করতে উস্কানি দেয়া হয়েছে।

এইচ আর ডব্লিউয়ের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক অ্যাডামস আরও বলেন, নাগরিকের যান-মাল রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখা সরকারের দায়িত্ব-এটা যেমন ঠিক, তেমনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও যে জবাবদিহি করা হবে তাও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, অপরাধ দমনের নাম করে বাড়াবাড়ি করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং যার ফলশ্রুতিতে আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হয়েছে এবং রাজপথে রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে বিরোধী দলের ৭ হাজারেরও বেশি সদস্যকে আটক রাখা হয়েছে যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতাও রয়েছেন। সরকার বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতেও নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।

প্রতিবেদনে সমালোচনা করে বলা হয়, গত ৩ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বেগম খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে এবং তখন থেকেই মূলত চলমান সহিংসতার সূত্রপাত।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, যদিও পরবর্তীতে খালেদার অফিসের গেট থেকে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং রাস্তা থেকে প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকার তার বাসার বিদ্যুত, টেলিফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বেশ কিছু সময়ের জন্য।

এছাড়া পেট্রোল বোমা হামলায় নিহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় বেগম জিয়াকে আসামী করে তাকে আটকেরও পায়তারা বর্তমান সরকার করছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।

পাশাপাশি সরকার জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতা এবং শত শত সমর্থককে জেলে পুরে রেখেছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়। আর এর ফলে গ্রেফতার আতংকে সংগঠনটির অনেকেই এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশ এই সহিংসতার বন্ধের যে আহবান জানিয়েছে সেদিকেও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করা হয় প্রতিবেদনে। ভারতের অবস্থানকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখে থাকে এমন দাবি করে প্রতিবেদনে এসব বাড়াবাড়ি বন্ধে ভারতের আহবানের কথাও উল্লেখ করা হয়।

অ্যাডামস বলেন, বাংলাদেশের এই সহিংসতাকে কোনভাবেই আর সহ্য করবে না বিশ্ববাসী। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে এই রক্তপাত বন্ধ না হলে বহির্বিশ্বে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়বে।

কেবি