৫ জানুয়ারির একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের এক সপ্তাহের মাথায় সরকারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের ইতি টানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাপনের কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেয় জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব।
যদিও পরবর্তীতে গত রমজানের পর দ্বিতীয় দফার আন্দোলন শুরু করার কথা ছিল ২০ দলীয় জোটের। দলের বিভিন্ন সারির নেতাদের পাশাপাশি খোদ বিরোধী জোট নেত্রী খালেদা জিয়াও সে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু রমজানের পর কঠোর আন্দোলনের পথে হাঁটেনি বিরোধী জোট।
আবারো বলা হয় পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রথমে শক্তিশালী করা হবে সাংগঠনিক ভিত। ফের জোরালো করা হবে জনমত। এর পরেই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইস্যুতে চুড়ান্ত আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
আর এই লক্ষকে সামনে রেখে ডিসেম্বর মাসে কঠোর আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা করছে বিএনপি। দলটির নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে এমন মনোভাবের কথাই জানা গেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ি চলতি মাসেই দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি ও দল পূণর্গঠনের কাজ শেষ করতে চায় দলটি । ২৯ নভেম্বর কুমিল্লায় ২০ দলীয় জোটের সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হচ্ছে চেয়ারপারসনের দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি। আর এ মাসের মধ্যেই যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের নতুন কমিটি ঘোষিত হবে।
এরপরেই ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন ও জোট নেত্রী সরকারকে সংলাপের জন্য শেষ বারের মত আল্টিমেটাম ঘোষণা করবেন। সেটি কুমিল্লার জনসভাতেও হতে পারে আবার ডিসেম্বরের প্রথম দিকে রাজধানী ঢাকায় কোনো জনসভা থেকেও করতে পারেন।
এরপর সংলাপের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়া গেলে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ধারাবাহিকভাবে হরতাল, অবরোধ ঘেরাওসহ অন্যান্য কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এসব কর্মসূচি ঠিক করতে আগামী সপ্তাহে দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান উপদেষ্টা পরিষদ ও যুগ্ম মহাসিচবদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপরেই ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে সেই সব কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে। যদিও এসব কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে বিএনপি চেয়ারপারসন ও জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর। তিনিই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আন্দোলনের জন্য ডাক দেবেন।
দলের অপর একটি সূত্রের মতে, এবার আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে কোনো পিঁছপা হবে না বিএনপি। এজন্য সময় নিয়ে সবদিক বিবেচনা করেই পূর্ণ শক্তি নিয়ে রাজপথের নামতে চায় তারা। কারণ তৃণমূল নেতারা মনে করছে এবার রাজপথে নামলে নক আউট পর্বের খেলা হবে। যার অর্থ হল হারলেই বিদায়। তাই আত্মবিশ্বাসী ও কৌশলী হয়ে আন্দোলনে যেতে হবে।
অন্যদিকে বিএনপি নেতাদের দাবী অনুযায়ী বর্তমান সরকার ‘অবৈধ’। তারা দেশের জনগণের সমর্থন না পেয়ে বৈধতার জন্য বিদেশীদের কাছে প্রতিনিয়ত ধর্না দিচ্ছেন। তাই এই সরকারের কোনো বৈধতাই নেই ক্ষমতায় থাকার।
প্রায় ১ বছর হতে চলল তারা জোর করে ক্ষমতায় আছে। কিন্তু এভাবে অল্প কয়েকদিনের জন্য থাকতে পারলেও তা দীর্ঘ সময়ের জন্য সম্ভব নয়। জনগণ আন্দোলনের জন্য মুখিয়ে আছে। যে কোনো সময় আন্দোলন শুরু হবে। আর জনগণ তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই সরকারকে বিদায় করবে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব) মাহবুবুর রহমান টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, আমরা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায় পার হয়ে এখন মধ্যবর্তী পর্যায়ে আছি। জনগণের অবস্থা বুঝেই চূড়ান্ত কর্মসূচি আসবে। দেশের জনগণ আন্দোলনের জন্য মুখিয়ে আছে। সরকার পতনের জন্য খুব শিগগিরই সেই আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করা হবে।
ডিসেম্বরে কঠোর কোনো কর্মসূচি আসছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটি বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে ঠিক করা হবে। তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা জনগণ এই দ্রুত এই সরকারকে বিদায় করে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শামসুজ্জামান দুদু বলেন, এই অবৈধ সরকারের হাত থেকে গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার জন্য কঠোর আন্দোলনের বিকল্প নেই। এবার আন্দোলন শুরু হলেই ফ্যাসীবাদি সরকার বুঝতে পারবে জনগণ কি চায়। এজন্য খুব তাড়াতাড়ি আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
যে কোনো কর্মসূচি সফল করার জন্য ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রস্তুত আছে দাবি করে ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল টাইমনিউজবিডি.কমকে বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া খুব শিগগিরই চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
তিনি আরও বলেন, ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন জনগণের দাবি। সেই দাবি আদায়ে নেত্রী গণআন্দোলনের ডাক দিবেন। জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায় করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৮ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা কিছুটা পরিলক্ষিত হলেও এখনও দেশের আপামর জনগণের কাছে বিএনপির জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি চেযারপারসনের জনসভায় মানুষের উপস্থিতি সেটিই বড় প্রমাণ। তাই দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে রাজপথের কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবী আদায়ে কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।
এমএইচ/এসএইচ





