বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। একদিকে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। অন্যদিক নানা অপকর্মে জর্জরিত। অভিযোগের ভারে মুহ্যমান। হালে সমালোচনার ঝড় উঠেছে এ সংগঠনকে ঘিরে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল, অপহরণ ও গুম-খুনসহ সবই রয়েছে তাদের আমলনামায়। বছরজুড়েই এদের সমালোচনায় মুখর রয়েছে সরকারী দল কিংবা বিরোধী মহল। এমনকি ছাত্রলীগের একাধিক সাবেক নেতার অভিযোগ তৃনমূল পর্যায়ে মানছে না কেন্দ্রের নির্দেশ। ফলে কার নিয়ন্ত্রনে ছাত্রলীগ এ নিয়ে উঠেছে নানান প্রশ্ন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401002352.jpg[/img]
প্রশ্ন উঠেছে ছাত্রলীগ এখন কার নিয়ন্ত্রনে? কার হাতে রয়েছে কলকাঠি? কে বা কারা পরিচালনা করছেন এই বড় সংগঠনটি? কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে নানা জটিলতায় এমন তথ্যই মিলছে হর-হামেশা। তাদের অস্ত্র ও পেশী শক্তির ভয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা থাকে শঙ্কিত। কেন্দ্রীয় সংসদের পক্ষ থেকে প্রায়ই সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চাঁদাবাজি বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের নেতারা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করে চলেন নিজস্ব স্টাইলে। এতেই প্রশ্ন উঠছে কার নিয়ন্ত্রনে ছাত্রলীগ!
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন দল সব ক্ষেত্রেই নিজের মত করে ব্যবহার করছে ছাত্রলীগকে। মন্ত্রী, এমপি এমনকি বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও তাদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। মন্ত্রীদের প্রোটকল দেয়া ও শোডাউনসহ বিভিন্ন সভা-সমাবেশে লোক সমাগমে আওয়ামী লীগকে সহায়তা করছে ছাত্রলীগ।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401002438.jpeg[/img]
গত ৩ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কমপক্ষে ৫টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ গত ৯ মে (শুক্রবার) অপহরণের পর মুক্তিপণের টাকা আদায়ের সময় ছাত্রলীগের ৫ নেতাসহ ৭ জনকে আটক করা হয়। এদের ছেড়ে দিতে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে চাপ দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ জনকে ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এছাড়া ৪ জনকে ছাত্রলীগ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে।
গত ৩১ মার্চ (সোমবার) রাতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সাদ ইবনে মমতাজকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগ। জানা গেছে, পরীক্ষার সময় পরিবর্তন নিয়ে ফিসারিজ অনুষদের ছাত্র সাদকে পিটিয়ে জখম করে তারই সহপাঠী ছাত্রলীগ কর্মী সুজয় কুমার কুন্ডু ও রোকনুজ্জামানসহ অন্য বন্ধুরা। পরে চরপাড়া এলাকার ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে মারা যায় সাদ। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও ১৪ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী জড়িত রয়েছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401002474.jpg[/img]
গত ২ ফেব্রুয়ারী (রোববার) বর্ধিত ফি বাতিল ও সান্ধ্য কোর্স বন্ধের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসমাবেশ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানার নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্র নিয়ে বেপরোয়া গুলি বর্ষণ করে ছাত্রলীগ। এতে অন্তত ৩০-৩৫ জন ছাত্রছাত্রী গুলিবিদ্ধ হন।
এছাড়াও ছাত্রলীগের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখার সাধারণ সম্পাদক এস.এম.সিরাজুল ইসলাম ৫ লাখ টাকার টেন্ডারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যানের মাথায় পিস্তল ঠেকায়। সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসানও তার সঙ্গে ছিল। এসময় তারা দুজন মিলে সৈয়দ আলম নামের ওই শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
২০১৩ সালের ১৬ জুলাই ছাত্রলীগের চাঁদাবাজির কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। জানা গেছে, বিভিন্ন কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। শেখ হাসিনা, সুফিয়া কামাল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল এবং প্রশাসনিক ভবন ও ড. ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞানাগারের কাজ চলছিল। এ কাজের জন্য ছাত্রলীগকে একাধিকবার চাঁদা দিয়েছে ঠিকাদাররা। এরপর ঈদকে সামনে রেখে আবারও ৮০ কোটি টাকার ২ শতাশং চাঁদা দাবি করে ছাত্রলীগ। পরে ঠিকাদাররা চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে কাজ বন্ধ করে দেয় ছাত্রলীগ।
২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের মাধবপুরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বাসার কাজের মেয়েকে ধর্ষণ করেছে ছাত্রলীগ নেতা। মেয়েটি অন্ত:সত্বা হলে এলাকার কয়েকজন মাতবর মিলে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে বিষয়টি রফাদফা করেন। উজেলার আন্দিউড়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি কাজী রিয়াদ এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।
এ ধরনের হাজারো অপকর্ম করে যাচ্ছে ছাত্রলীগ। একের পর এক এমন ঘটনা ঘটিয়েও বহাল তবিয়তে দাবড়িয়ে বেরাচ্ছে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। এমনই পটভূমি এখন অনেকেরই প্রশ্ন কার নিয়ন্ত্রনে এককালের এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটি।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1401002514.jpg[/img]
যাদের নিয়ন্ত্রনে ছাত্রলীগ
খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস, নিজেদের অর্ন্তদ্বন্দ, প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংঘর্ষসহ বিভিন্ন কু-কীর্তিতে বিরক্ত হয়ে ২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ছাত্রলীগকে দেখভালের দায়িত্ব নেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে সাবেক কয়েকজন প্রভাবশালী ছাত্রনেতা পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ছেন ছাত্রলীগের। চালাচ্ছেন তাদের খেয়াল-খুশি মতো।
ছাত্রলীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার ২জন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের বর্তমান দপ্তর সম্পাদকসহ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার ও মাহমুদ হাসান রিপনের পরামর্শেই চলছে ছাত্রলীগ। অভিযোগ রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস সাইফুজ্জামান শেখরসহ প্রধানমন্ত্রীর দফতর ও গণভবনকেন্দ্রীক অনেক নেতাও ছাত্রলীগ পরিচালনায় নেপথ্যে কাজ করছেন।
ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও বিভিন্ন নেতার হয়ে কাজ করেন। তবে ছাত্রলীগের অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ক্ষুব্ধও বটে। ছাত্রলীগের হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা প্রায়ই বলেন, ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের কোন অঙ্গ-সংগঠন নয়। তাদের কর্মকান্ডের দায় তাদেরকেই নিতে হবে। তাদের কথা তাদেরকেই জিজ্ঞাসা করুন।
একটি সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রলীগের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মী তাদের এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী-এমপিদের হয়েই কাজ করে। তাদের কথায় ওঠাবসা করে ছাত্রলীগ।
গত শুক্রবার (১৬ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) অডিটরিয়ামে এক আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ছাত্রলীগকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, অনেক করছো এবার থামো। আর খারাপ খবরের শিরোনাম দেখতে চাই না। গুটি কয়েক অন্যায় করবে তার দায়ভার পুরো দলকে নিতে হবে। তা হতে দেয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগের গুটি কয়েক নেতাকর্মীর অপকর্মের কারণে আমাদের অর্জনগুলো ধুলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। যারা এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে প্রতিরোধ করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার টাইম নিউজবিডিকে বলেন, ছাত্রলীগে কিছু অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। উপর মহলের নির্দেশ ছাত্রলীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা মানছে না। যার কারণে ছাত্রলীগের আজ দূরবস্থা। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নিয়মিত ছাত্রদের হাতে নেতৃত্ব দিতে হবে। ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ যে কোন ছাত্র নেতৃত্বেই এটা প্রয়োজন।
ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের বর্তমান উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক অসীম কুমার উকিল টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ছাত্ররা সুন্দর পবিত্র। তারা বাংলার অহংকার। বর্তমান সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ছাত্রদের উপর পড়ছে। ছাত্র রাজনীতি যেমন আমাদের গৌরব এনে দিয়েছে, তেমনি তাদের কর্মকান্ড আমাদেরকে বিভ্রান্ত ও বিচলিত করছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সবাইকে মিলে আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধান বের করতে হবে। কারণ তারা আমাদের সন্তানের মত। এছাড়াও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া দরকার।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, বিভিন্ন নেতৃত্বের কারণে ছাত্র লীগের এ অবস্থা। নেতৃত্বে যারা রয়েছেন তাদের কারণেই সংগঠনটি আজ সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ টাইম নিউজবিডিকে বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এক ঝাঁক তরুণদের সংগঠন। তারুণ্যের নেতৃত্বেই ছাত্রলীগ এগিয়ে যাচ্ছে।
সাবেক নেতাদের পক্ষ থেকে পরামর্শ পাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সোহাগ টাইমনিউজবিডিকে বলেন, অবশ্যই সাবেক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমাদের যোগসূত্র রয়েছে।
এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদারের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
[b]ঢাকা, এমআর, ১৬ মে (টাইমনিউজবিডি.কম)// কেবি[/b]
রাজনীতি
নিয়ন্ত্রনহীন ছাত্রলীগ, কার হাতে কলকাঠি
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। একদিকে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। অন্যদিক নানা অপকর্মে জর্জরিত। অভিযোগের ভারে মুহ্যমান। হালে সমালোচনার ঝড় উঠেছে এ সংগঠনকে ঘিরে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল, অপহরণ ও গুম-খুনসহ সবই রয়েছে তাদের আমলনামায়





