বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাশের প্রতিবাদে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর সোমবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিরোধী জোটের এটাই প্রথম হরতালের কর্মসূচি। এর আগে যে সব কর্মসূচি দেয়া হয়েছিলো, সেগুলো ছিলো প্রতিবাদ সমাবেশ, পতাকা মিছিল বা সমাবেশের মতো নিরুত্তাপ কর্মসূচি।
বিরোধী জোটের নিরুত্তাপ কর্মসূচিকে নিয়ে সরকারের মন্ত্রী এমপিরাও নানান হস্যকর মন্তব্য করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লষকদের মতে, এবার বিরোধী জোট সর্তকতার সঙ্গে আন্দোলন করতে চায়। একারণে বুঝেশুনে কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে ২০ দলের পক্ষ থেকে।
তবে সোমবারের হরতাল কর্মসূচি বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে ডাকা হলেও এটা মূলত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের একটি সূত্রপাত মাত্র।
দীর্ঘ দিন আন্দোলনের বাইরে থাকলে দলের নেতাকর্মীদের মধ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাছাড়া সরকারও তাদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার দিকেই এগিয়ে যাবে। তাই ঈদের পর সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরুর জানান দেয়াও হবে এর উদ্দেশ্য।
গত বছর তফসিল ঘোষণার পরই ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট।
কিন্তু তৎকালীন অওয়ামী লীগ সরকার একদলীয় নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
পরবর্তিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল বাতিল ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২৬ নভেম্বর থেকে দফায় দফায় রাজপথ, রেলপথ ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচী পালন করতে শুরু করে।
প্রথম দফায় ২৬ নবেম্বর থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত টানা ৭২ ঘণ্টা, দ্বিতীয় দফায় ৩০ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর টানা ১৩১ ঘণ্টা, তৃতীয় দফায় ৭ ডিসেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ১৪৪ ঘণ্টা এবং চতুর্থ দফায় ১৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট।
পঞ্চম দফায় ২১ ডিসেম্বর থেকে পালন করা হয় টানা ৮৩ ঘণ্টা অবরোধ কর্মসূচী, যা ২৪ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে। এর পর ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচি ঘোষণা করেও তা পালন করতে পারেনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট।
এর পর ১ জানুয়ারি থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজপথ, রেলপথ ও নৌপথ কর্মসূচি পালন শুরু করে। আর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাতিলের দাবিতে সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি সকাল ৬টা থেকে টানা ৪৮ ঘণ্টা সারাদেশে হরতাল পালন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট।
সে সময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতারা অভিযোগ করে আসছিলো-গণদাবি উপেক্ষা করে সরকার নির্লজ্জের মতো একতরফাভাবে নির্বাচন করতে যাচ্ছে। যে নির্বাচনে বিশ্বের কোন দেশেরই সমর্থন নেই। শুধু এক ব্যক্তির ক্ষমতার মোহকে কেন্দ্র করে সরকার এই নির্বাচন করতে যাচ্ছে। তাই সারাদেশের মানুষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করবে।
কিন্তু সংঘাত ও চরম সহিংসতার মধ্য দিয়ে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এর পর অনেকটা নিরব ভূমকায় চলে যায় বিএনপি।
২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বে থাকা দেশের বৃহত্তম এই দলটি আন্দোলন প্রশ্নে গা ছাড়া ভাব জোটের অন্য শরীক দলগুলোকেও ভাবিয়ে তোলে। দিনে দিনে মনে হয় সরকারের কৌশলের কাছে বিএনপি বড় অসহায়।
যদিও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করেছিল তৎকালীন ১৮ দলীয় জোট, কিন্তু তা বিএনপির একক সমাবেশে রূপ নেয়। এরপর জোটের পরিধি বেড়ে হয় ২০ দল।
এর পর ফিলিস্তিনের গাজায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের বর্বর, নির্মম ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে কালো পতাকা মিছিল করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে লাখো জনতার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কালো মিছিল থেকে ইসরাইলী পণ্য বর্জনের পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের বিচারের দাবি জানানো হয়। ৫ জানুয়ারির সরকারের ‘একতরফা’ নির্বাচনের পর ২০ দলীয় জোটের এটিই প্রথম বড় ধরনের কর্মসূচি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এর আগে বিরোধী জোটের এতো বড় মিছিল আর হয়নি। মিছিলটির সামনের অংশ যখন মালিবাগ মোড়ে গিয়ে পৌঁছে তখনও এর মধ্যভাগ থেকে যায় নয়াপল্টন এলাকায়। মিছিলটি শেষ হতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগে। লাখো জনতার এ জনসমুদ্র যে যার এলাকায় দাঁড়িয়ে থেকে কালো পতাকা উঁচিয়ে বিশ্ব সভ্যতার অভিশাপ বর্বর ইসরাইলের প্রতি হৃদয়ের ঘৃণা প্রকাশ করেন।
আর্ন্তজাতিক গুম দিবস উপলক্ষ্যে সারাদেশব্যাপী সকল প্রকার গুম ও খুনের প্রতিবাদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের উদ্যোগে ৩০ আগস্ট কর্মসূচি পালন করা হয়।
এর আগে সম্প্রচার নীতিমালার প্রতিবাদে ১৯ আগস্ট রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতিবাদ সমাবেশ করে জোট।
এসব নমনীয় ও একান্ত দলীয় কর্মসূচির পালন করে আসছিলো বিরোধী জোট।
এর পর বর্তমান সরকারের সময়ে এই প্রথম হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো। এর মাধ্যমে সরকার বিরোধী আন্দোলনে নতুন করে স্পৃহা সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয় বিরোধী জোটের এই আন্দোলন কোন দিকে যায়।
ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেএ





