প্রবীণ রাজনীতিক গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, পবিত্র রমজান মাসে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে চাই না। আল্লাহ বলেছেন, ওয়াদা ভঙ্গ করো না। ওয়াদা ভঙ্গকারীরা মোনাফেক; তাদের থেকে দূরে থাক। আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা হলো, কাফেরের চেয়ে মোনাফেক বেশি খারাপ। দেশের বেশির ভাগ মানুষ ভালো এবং সৎভাবে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হলেও মোনাফেকে দেশ ভরে গেছে। রাজনীতির নামে মুখে যা বলেন করেন তার উল্টো কাজ।
গতকাল জাতীয় দৈনিক ইনকিলাবের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় তিনি এসব কথা বলেন।
মতিঝিলের নিজস্ব চেম্বারের বঙ্গোপসাগরের সীমানা নিয়ে দ্য হেগের আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায়, দক্ষিণ তালপট্টি এবং সমসাময়িক বিষয়াদি প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, দেশের বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে ঐকমত্য আছে। সুশাসন, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ন্যায় বিচারের পক্ষে দেশের সাধারণ মানুষ। কিন্তু কিছু ব্যক্তির কারণে এসব হচ্ছে না। তিনি বলেন, দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ ’৭৪ সাল থেকে। ৪০ বছর ধরে এ নিয়ে কাজ করছি। জাতীয় ইস্যু নিয়ে বিতর্ক করার আগে সবার উচিত রায় পড়ে নেয়া।
প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন চলমান রাজনৈতিক অঙ্গনে কাদা ছোড়াছুড়ি, বিতর্ক নিয়ে কথা বলে কারো বিরাগভাজন হতে চাচ্ছেন না। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে তিনি ব্যক্তি-বিশেষের বিরাগভাজন হতে চান না। বললেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। সুশাসনের ব্যাপারে কারো দ্বিমত থাকা উচিত নয়। মানুষ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন, সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষপ্রতিষ্ঠান, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাজনীতি দেখতে চায়। এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে ঐকমত্য আছে। কিন্তু কিছু ব্যক্তি নিজের স্বার্থে, দলীয় স্বার্থে রাজনীতির নামে এসব করছেন, সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করছেন। মুষ্টিমেয় কিছু লোক দেশের কোটি কোটি মানুষের মধ্যে অশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। রাজনীতি থেকে যেন ‘নীতি’ হারিয়ে গেছে। কেউ কেউ বলে থাকেন দেশ দুই জমিদারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে ভুল করে না। অন্তত ’৯০-এর পর থেকে মানুষ বার বার সরকার পরিবর্তন করেছে। মানুষ কেন এটা করেছে তা শাসকদলের দিকে তাকালে বোঝা যায়। দেশের তরুণরা দুর্নীতিমুক্ত, সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত সমাজ দেখতে চায়। সেটা আমাদের জন্য আশাবাদের কারণ।
বঙ্গোপসাগরের সীমারেখা এবং তালপট্টি নিয়ে দ্য হেগের সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিতর্ককে অনাকাক্ষিত হিসেবে অবিহিত করে আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ ড. কামাল হোসেন বলেন, ৪০ বছর ধরে তালপট্টি নিয়ে কাজ করছি। ভারতের সঙ্গে এ নিয়ে বিরোধ এবং আলোচনা চলে আসছে ’৭৪ সাল থেকে। সবার উচিত (আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ) রায় পড়ে বুঝে তারপর মন্তব্য করা। ইন্টারনেটে রায় পাওয়া যাচ্ছে। সেখান থেকে যে কেউ রায়ের কপি বের করতে পারেন। পড়েন, জানেন, বোঝেন তারপর কথা বলুন। সবকিছুতেই রাজনীতি চলে না। রাজনীতি করা উচিত নয়। তালপট্টি জাতীয় ইস্যু; এটা আমাদের এটা জাতীয় দাবি।
সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিশাল ভলিয়্যুমের পাতা উল্টাতে উল্টাতে কিছু অংশ পড়ে শুনিয়ে, অংকিত ম্যাপ দেখিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই আইনজীবী বললেন, তালপট্টি নিয়ে ’৭৪ থেকেই বিরোধ ছিল ভারতের সঙ্গে আমাদের। ভারত যে সমুদ্রের সীমারেখা দেখিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে প্রস্তাবনা দিয়েছে; ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেয়নি। সেটা নিলে আমরা ন্যায় বিচার পেতাম না। ‘সমদূরবর্তী পদ্ধতি আমলে না নিয়ে সালিশি ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের দেয়া রায় আমাদের পক্ষ্যেই হয়েছে। ভারতের দাবি অনুযায়ী রায় হয়নি। এ রায় জাতির অর্জন। এ নিয়ে সবার আনন্দোবোধ করা উচিত। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারছি না কেন? সে জন্যই বলি রায় আগে পড়েন তারপর কথা বলেন।
তিনি বলেন, এই তালপট্টির ব্যাপারে আমাদের সব সরকার নিজেদের অবস্থানে কঠোর ছিল। কোনো সরকার এ ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করেনি। এটা প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত।
‘প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে তালপট্টির অস্তিত্ব নেই’, ‘বিএনপির নেতারা দাবি করছেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কারণে দিল্লীর ছক অনুযায়ী তালপট্টি ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে’, ‘সজিব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, জিয়াউর রহমান দক্ষিণ তালপট্টি ভারতকে দিয়েছে’, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, ভারতের হাতে তালপট্টি তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত আগেই হয়েছিল আদালতে নাটকের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হলো’ এসব বক্তব্য-মন্তব্যকে কীভাবে দেখছেন? প্রশ্ন শুনেই তিনি বলেন, এজন্যই বলি সবার উচিত আগে ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায় পড়া তারপর বিতর্ক করা। এ সব বিতর্কে নিজেকে জড়াতে চাই না। দুই দল (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) নিয়ে কথা বললে ওরা আবার প্রচার করবে জামায়াতের পক্ষে কথা বলে ড. কামাল হোসেন ‘রাজাকার’ হয়ে গেছেন। বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর বেলায় সেটা হয়েছে। রমজান সিয়াম সাধনার মাস। এ মাসে এসব নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। রমজানের পর কথা বলবো। তবে আমি সকলকে বলবো দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে বিরোধ ’৭৪ সাল থেকে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায় বিবেচনার ‘রাজনীতি’ না করে রায় পড়ে দলীয় গণ্ডির ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনা বিতর্ক করুন।
ঢাকা, ১৩ জুলাই(টাইমনিউজবিডি,কম)//এনএস





