দলে বড়ো ধরনের শুদ্ধি অভিযানে নেমেছেন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ অভিযান চলবে। ছাত্রলীগের পর এবার যুবলীগের পালা।

দখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-অস্ত্রবাজি-ক্যাডারবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত সারাদেশের যুবলীগের ৫০০ নেতাকর্মীর তালিকা এখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে। বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা প্রমাণসহ এ তালিকা জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এরই অংশ হিসেবে যুবলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে সংগঠনের ট্রাইব্যুনালে ডাকা হচ্ছে। তারা হচ্ছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

এই দুই নেতার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। তিনি সমকালকে বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই অভিযুক্ত দু'জনকে সংগঠনের ট্রাইব্যুনালে ডাকা হবে। শৃঙ্খলাজনিত বিষয়ে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যুবলীগে একটি ট্রাইব্যুনাল কমিটি রয়েছে।

সংগঠনের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী এই কমিটির প্রধান। তিনি বলেছেন, অভিযোগের বিষয়ে দুই নেতার বক্তব্য জানার পর তাদের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর ট্রাইব্যুনালে ডাকাটাই শোকজ হিসেবে বিবেচিত হবে।

কিছুদিন ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজ থেকে কমিশন দাবি, টাকার বিনিময়ে কমিটিতে পদ দেওয়া, অবৈধভাবে ক্ষমতা প্রদর্শনসহ ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদ থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা আসে।

বৈঠক–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার নানা অপকর্মের পাশাপাশি দলের আরেক সহযোগী সংগঠন যুবলীগের ঢাকা মহানগরের কোনো কোনো নেতার অপকর্মের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, যুবলীগের কোনো কোনো নেতা চাঁদাবাজির টাকা হালাল করার জন্য নানা কর্মসূচি পালন করেন। একজন নেতা অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য বাইরে জানাজানি হওয়ার পর ছাত্রলীগের পর এখন আলোচনায় আছে যুবলীগ। সংগঠনের কার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পরে, তা নিয়েও নানামুখী আলোচনা আছে।

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ সমকালকে জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে দুই নেতাকে ট্রাইব্যুনাল কমিটিতে ডাকা হবে। সেই সঙ্গে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হবে।

এরপর নেওয়া হবে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। তবে, ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তারা গতকাল পর্যন্ত কোনো চিঠি পাননি। উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে দুই নেতা অবশ্য সমকালকে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

'এমন যুবলীগের দোয়ার প্রয়োজন নেই' জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে বলেছেন, কিছুতেই এসব অপকর্ম সহ্য করা হবে না। অস্ত্রবাজি ও ক্যাডার রাজনীতি চলবে না। যে কোনো মূল্যে এই অপরাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী গত ৭ সেপ্টেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের যৌথ বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতাদের একটি ছবি দেখান। ওই ছবিতে সশস্ত্র ব্যক্তিদের প্রহরায় যুবলীগের একজন নেতাকে দেখা গেছে। ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতারা যুবলীগের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে জুয়ার আড্ডায় অংশগ্রহণের অভিযোগ আনেন।

নানা অপকর্মে যুবলীগের নেতারা : জানা গেছে, কাওরানবাজার এলাকায় যুবলীগের এক নেতা দাপটের সঙ্গে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তার রুম থেকে যুবলীগের ঐ নেতাকে বেরও করে দেন। কেন্দ্রীয় যুবলীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য ছাত্রজীবনেই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজ হিসেবে। ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শিক্ষা ভবনে টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে পিটুনি খেয়েছিলেন তিনি।

গ্রেফতার অবস্থায় পত্রিকায় তার ছবি ছাপা হয়েছিল। এরপর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। আবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু শিক্ষা ভবন ছাড়েননি সেই নেতা।

চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করতে কেন্দ্রীয় যুবলীগের তদন্ত কমিটি গঠন

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষোভের কথা শুনে অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে যুবলীগ। এজন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় যুবলীগে একটি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। দলীয় কেউ কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে বিচারের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে শাস্তি দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্তদের ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি করা হবে।