বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের লন্ডন সফর মূল্যায়ন করছে সরকার। লন্ডনে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি বড় কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেননি। তবে সিনিয়র ভাইসচেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব। মহাসচিবের সঙ্গে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দীর্ঘ সময়ের দূরত্বও কেটে গেছে বলে জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠরা।

সূত্র জানায়, মির্জা ফখরুলের লন্ডন সফরকে যেভাবে সফল দেখছে বিএনপি, তেমনি এই সফরে কড়া নজর রেখেছে সরকার। সরকারের দুইটি গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা লন্ডনে বসেই তারেক-ফখরুলের বৈঠকগুলো মনিটরিং করেছেন।

মির্জা ফখরুল দেশে ফেরার পর চলছে তার লন্ডন সফরের পর্যালোচনা। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একটি শক্তিশালী টিম এই পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন তদারকি করছে। বিএনপির পরবর্তী যে কোনো কর্মসূচির প্রতিও তারা কড়া নজর রাখছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, অসুস্থতার কথা বলা হলেও মির্জা ফখরুল লন্ডনে রাজনৈতিক নানা কর্মসূচি এবং গোপন সভা করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব কর্মসূচিতে কড়া নজর রাখা হয়েছে। লন্ডনস্থ বাংলাদেশী দূতাবাসের কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের একটি টিম পৃথক ভাবে ফখরুলের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছে।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে লন্ডন থেকে লিখিত ভাবে পৃখক পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পৌঁছেছে।

সূত্রমতে, মির্জা ফখরুল প্রকাশ্যে রাজনৈতিক নানা কর্মসূচিতে অংশ নিলেও মোট ১১ টি গোপন সভা করেন। এর মধ্যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভারতের একটি প্রতিনিধি দল, লন্ডনে নির্বাসিত সেনা কর্মকর্তা ও সাংবাদিক, সাবেক ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে তিনি পৃথক গোপন বৈঠক করেন।

তিনি গ্রুপগুলোর সঙ্গে গোপন বৈঠক করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেন।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিএনপির নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন ফখরুল। কিংসটনে তারেক রহমানের বাসা, মধ্য লন্ডনের একটি বাংলা রোস্তোরা এবং ক্যানারিওয়ার্ফের হোটেল হিল্টনে তিনি বৈঠকগুলো করেন।

মধ্য লন্ডনের এক বৈঠকে অংশ নেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মুহিদুর রহমান, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য সচিব মুশফিকুল ফজল আনসারী, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক, সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও তারেক রহমানের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আবদুস সালাস, উপদেষ্টা আবু সায়েম, হুমায়ুন কবির প্রমুখ।

বৈঠকে সারাবিশ্বে বিএনপির রাজনীতিকে শক্তিশালী করণ এবং বাংলাদেশে নতুন নির্বাচন আয়োজনে সরকারের ওপর চাপ প্রযোগের জন্য নানা কার্যক্রমের বিস্তারিত আলোচনা হয়।

ইস্ট লন্ডনের অজ্ঞাত স্থানে তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুলের মধ্যে তিন দফায় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। এ বৈঠকেই মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিএনপির পরবর্তী করণীয়, বিএনপির নতুন কমিটি সহ সার্বিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। তারেক রহমান সম্ভাব্য কমিটির তালিকা হস্তান্তর করেন মির্জা ফখরুলের কাছে।

ক্যানারিওয়ার্ফের হোটলের হিল্টনে মির্জা ফখরুল দফায় দফায় বৈঠক করেন যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ছাত্রদলের সাবেক ছাত্রনেতাদের সাথে।

এ বৈঠকে অংশনেন ছাত্রদলের সাবেক নেতা নসরুল্লাহ খান জুনায়েদ, পারভেজ মল্লিক, নাজমুল হাসান জাহিদ, আমিনুল ইসলাম, মাওলানা শামীম আহমেদ, হাসিবুল হাসান, শরফরাজ আহমেদ শরফু, জাহাঙ্গীর আলম শিমু, আবু তাহের, কামরান জাকি বিল্লাহ, শেখ তারেকুল ইসলাম, মাহাবুবুর রহমান প্রমুখ।

উন্নয়ন কর্মী, সাংবাদিক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের সাথেও তিনি বৈঠক করেন। সফরের শেষ দিনে সার্বিক বিষয় নিয়ে মির্জা ফখরুল তাদের সাথে বৈঠকে বসেন। এ বৈঠকে অংশ নেন নির্বাসিত সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী, অলিউল্লাহ নোমান, সালেহ শিবলি, এস এম মাহবুবুর রহমান, নূরে আলম বরষণ, মাহবুব আলী খানশূর, দাতব্য উন্নয়ন কর্মী ফরিদুল ইসলাম, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর অব. সিদ্দিক, মেজর অব, ফারুক প্রমুখ।    

বিগত সময়ে যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সাবেক ছাত্রনেতাদের ভূমিকার প্রশংসা করেন মির্জা ফখরুল। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিজ নিজ এলাকায় কার্যকর ভূমিকা রাখার পরমর্শ দেন তাদের।

এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমরা বড় কোনো কর্মসূচির আয়োজন করিনি। তবে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছেন। দলীয় নেতাকমীরা তাঁর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাত করেছে এবং তিনি খোঁজ খবর নিয়েছেন। আবার আনুষ্ঠানিক দুটি কর্মসূচিতেও তিনি অংশ নিয়েছেন। কোনো গোপন বৈঠক হয়নি।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে আন্দোলন চলছে, তার পক্ষে গণতন্ত্রের পূণ্যভূমি যুক্তরাজ্যে অবস্থিত বাংলাদেশী প্রবাসীরা সব সময় ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে ও রাখবে।

এদিকে সরকারি সূত্র বলছে, লন্ডনে মির্জা ফখরুল কার্যকর কোনো কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হলেও সরকার এ সফরকে গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছে। পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট পর্যালোচনা শেষে প্রযোজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, মির্জা ফখরুল ষড়যন্ত্র করতে লন্ডন গিয়েছিলেন। বিএনপির ষড়যন্ত্রেই দেশে অশান্তির দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ তাদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছে। আমরা সব কিছু ওয়াচ করেছি। এবার পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এমআইএস