জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও পাবনা সদর আসনের পাঁচ বারের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আব্দুস সুবহানের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণী-পেশার লাখো জনতা।

শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টায় পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন ঐতিহাসিক দারুল আমান ট্রাস্ট ময়দান মাঠে মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

দুপুর ১টার মধ্যেই ভরে যায় ট্রাস্ট ময়দান। মাঠে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় কলেজ মাঠ, কিন্ডার গার্টেন স্কুল মাঠ, ইসলামিয়া মাদরাসার প্রতিটি কক্ষ, ছাদ, ইসলামিয়া ডিগ্রী কলেজের ছাদ, ময়দান থেকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, গোল চত্বরসহ আনাচে কানাচের বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে মানুষ জানাজায় অংশ নেন। জানাজা শেষে তাকে আরিফপুর কবরস্থানে তার সহধর্মীনীর পাশে দাফন করা হয়।

জানাজায় ইমামতি করেন মরহুমের ছোট ছেলে হাফেজ মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম।

জানাজাপূর্ব বক্তব্য রাখেন- জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল, পাবনা জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডল, সেক্রেটারি অধ্যক্ষ ইকবাল হুসাইন, মরহুমের ছেলে নেছার আহমেদ নান্নু, জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর মাওলানা আব্দুর রহীম, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, জেলা বিএনপির আহবায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছেলে শামীম সাঈদী, মরহুমের বড় ছেলে আব্দুল হালিম লাল প্রমুখ।

জানাজায় অংশ নেন, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম, সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ, নির্বাহী পরিষদ সদস্য শাহাবুদ্দিন, মোবারক হোসাইন, কর্মপরিষদ সদস্য প্রফেসর আবুল হাশেম, কেরামত আলী, ড. রেজাউল করিম, মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, আবুল কালাম আজাদ, শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো: সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, অফিস সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ।

জানাজার আগে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান লাখো জনতাকে সাক্ষী রেখে বলেন, মাওলানা আবদুস সুবহান নির্দোষ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি পাবনাসহ সারা দেশের মানুষকে ইসলামের পথে সারা জীবন ডেকেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি সারা বিশ্বের কাছে একজন ইসলামের খাদেম হিসেবে পরিচিত ছিলেন।  তিনি বলেন, মাওলানা আবদুস সুবহানকে হারিয়ে পাবনাবাসীসহ আমরা একজন অভিভাবককে হারালাম। আল্লাহ তাকে জান্নাতে উত্তম জাযা দান করেন।

আবদুস সুবহানের রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালনে সকলের প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, তিনি নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে আমাদের শিখিয়ে গেলেন অন্যায়ের কাছে কখনো মাথানত করা যাবে না। আমরাও কখনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করবো না।

এদিকে, জানাজায় অংশ নেয়া ষাটোর্ধ্ব কয়েকজন জানান, তাদের জীবনে কখনো কোনো জানাজায় এতো মানুষ দেখেননি।

এর আগে শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মাওলানা সুবহানের মৃত্যু হয়। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঢাকা থেকে মরহুমের লাশ সেদিন দিবাগত রাত ৩টার দিকে নিজ শহর পাবনায় নিয়ে আসা হয়। রাত থেকেই হাজার হাজার মানুষ তাকে একনজর দেখার জন্য ছুটে আসেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন।

উল্লেখ্য, মাওলানা সুবহানের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সুজানগর থানার মানিকহাটি ইউনিয়নের তৈলকুণ্ডি গ্রামে। তার বাবার নাম শেখ নাঈমুদ্দিন, মায়ের নাম নুরানী বেগম। আবদুস সুবহান জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করায় সংগঠনে তার প্রভাব ছিল উল্লেখ করার মত।

তিনি জামায়াতের মনোনয়ন পেয়ে পাবনা-৫ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সবশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের মনোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সুবহান পাকিস্তান আমলে ছিলেন পাবনা জেলা জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য। তিনি পাবনা আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক হেড মাওলানা ছিলেন।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে আবদুস সুবহানকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২৩ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।  ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের এই প্রভাবশালী নেতাকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রাণদণ্ড দেন গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

প্রসিকিউশনের আনা ৯টি অভিযোগের মধ্যে ছয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

রায়ের দিন সুবহানকে নির্দোষ দাবি করে তার ছেলে নেছার আহমদ নান্নু বলেছিলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মিথ্যা মামলায় তাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে।

এমবি