আর কি কোনদিন দেখা মিলবে স্বামীর? প্রিয় সন্তান কি পাবে বাবার আদর? এমনই আশা-নিরাশার দোলায় যখন দুলছিল গোটা পরিবার, তখনই একটি ফোন পাল্টে দেয় গোটা চিত্র। মুহুর্তে হতাশার স্থলে জেগে উঠে আশার আলো। শুরু হলো অপেক্ষার পালা। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষনের দেখা মিললো সোমবার রাতে। এতদিনের অপেক্ষার পর কাঙ্খিত মুহুর্তে যেন সব আনন্দ অশ্রু হয়ে ঝরে পড়লো অঝোরে।
দীর্ঘ দুই মাসেরও বেশি দিন পর স্ত্রী হাসিনা আহমদের সাথে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের সাক্ষাতে এমনই এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল শিলং সিভিল হাসপাতালের বন্দি সেলে।
আজ (সোমবার) রাত সাড়ে ৮টায় দেখা হয় দু’জনের। এ সময় তাদের চোখে ছিল পানি। দু’জনে কথা বলেছেন একান্তে। চিকিৎসা ও আইনী প্রক্রিয়া নিয়ে স্ত্রীর সাথে পরামর্শও করেছেন সালাহউদ্দিন।

স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় মেঘালয়ের শিলং পৌঁছান হাসিনা আহমদ। রোববার রাতে ঢাকা থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে প্রথমে তিনি কলকাতা যান। কলকতা থেকে আসামের গোয়াহাটি হয়ে সন্ধ্যায় শিলংয়ে পৌঁছান তিনি। তার সাথে রয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদের বোন জামাই মাহ্বুবুল কবির মুনমুন।
গত ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে অপহরণ হওয়ার পর থেকে স্বামীর সন্ধান পেতে গত দুই মাস দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন হাসিনা আহমদ। প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছেন। আদালতে গেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধর্ণা দিয়েছেন। হাসিনা আহমদের বিশ্বাস ছিল-স্বামীকে ফিরে পাবেন তিনি।
গত ১২ মে শিলংয়ে সালাহউদ্দিনের সন্ধান পান তিনি। সালাহউদ্দিন নিজেই স্ত্রীর কাছে ফোন করে নিজের অবস্থানের কথা জানান।
সালাহউদ্দিন জানান, তাকে অপহরণকারীরা শিলংয়ে ফেলে রেখে গেছে। শিলং পুলিশ তাকে প্রথমে মিমহ্যান্স মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে। এখন তিনি সিভিল হাসপাতালে বন্দি অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিএনপির সহ দফতর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি জানান, সন্ধ্যা ৬টায় হাসিনা আহমদ শিলং পৌঁছান। এরপরই তিনি স্বামীর সাথে দেখা করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের কাছে সময় চান। একইসাথে তিনি শিলংয়ের পুলিশের কাছে স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার প্রাথমিক বিবরণ দেন।

জনি জানান, রাত সাড়ে ৮টার দিকে সিভিল হাসপাতালের বন্দি সেলে সালাহউদ্দিনের সাথে স্ত্রীর সাক্ষাত হয়। দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ায় দু’জনেই কেঁদেছেন। প্রায় আধাঘণ্টা তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলেন।
জনি বলেন, স্ত্রী চলে আসায় এখন দ্রুত আইনী বিষয়গুলোতে পদক্ষেপ নেয়া হবে। স্থানীয় আইনজীবীদের সাথে আজকালের মধ্যেই কথা বলবেন তারা।
উন্নত চিকিৎসার জন্য তৃতীয় দেশে নেয়া হতে পারে
এদিকে,আরেক সূত্রে জানা যায়, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৃতীয় দেশে নিতে চায় পরিবার।
সোমবার রাতে ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে অবস্থিত সিভিল হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ গণমাধ্যম কর্মীদের এ কথা বলেন।হাসিনা আহমদ স্থানীয় সময় রাত সাড়ে আটটা থেকে নয়টা পর্যন্ত সিভিল হাসপাতালে স্বামীর ওয়ার্ডে ছিলেন।
হাসিনা আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ভারত সরকারের কাছে খুব বেশি কৃতজ্ঞ। সাথে এখানকার স্থানীয় প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছেও খুব বেশি কৃতজ্ঞ। কারণ, তারা আমার স্বামীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং তাঁকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। আমার স্বামী খুব বেশি অসুস্থ। আমরা চেষ্টা করব উনাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৃতীয় কোনো দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য।’
আইনগত বিষয় নিয়ে সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে হাসিনা আহমদ বলেন, ‘উনি যেহেতু অসুস্থ, তাই উনার সঙ্গে আজ খুব বেশি কথা বলতে পারিনি। কাল সকালে আমি আবার আসব। উনার সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি ঠিক করব।’
আইনজীবী নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে কি না—জানতে চাইলে সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী বলেন, ‘কাল আসার সময় আইনজীবী নিয়ে আসার চেষ্টা করব। এ নিয়ে উনার সঙ্গে কথা বলব।’
হাসিনা আহমদ চলে যাওয়ার পর সালাহ উদ্দিনের চিকিৎসক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ জি কে গোস্বামী বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমকে জানান, আজ সকালে তাঁর সিটি স্ক্যান করার পর বিকেলে আরও কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়েছে। আশা করছি কাল (মঙ্গলবার) সকালে প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। কাল তাঁর স্বাস্থ্যগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
সুস্থ হলেই আদালতে উঠানো হবে
এদিকে, চিকিৎসকের ছাড়পত্র পাওয়া গেলে সালাহ উদ্দিনকে আগামীকাল মঙ্গলবার আদালতে নেওয়া হতে পারে বলে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে।
গত সোমবার ভোরে শিলংয়ের গলফ-লিংক এলাকায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরির সময় সালাহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে সেখানকার পুলিশ। পরদিন থেকে পুলিশি পাহারায় শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি।
তাঁকে হাসপাতালের অ্যানেক্স ভবনে বিচারাধীন মামলার আসামিদের ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাঁকে আদালতে তোলা হবে। তবে শিলংয়ে তিনি কীভাবে পৌঁছালেন, সেই রহস্যের উদ্ঘাটন হয়নি।
কেবি





