মিনু-বুলবুল দ্বন্দ্বের জের ধরে বিএনপির একের পর এক নেতাকর্মী পদত্যাগ করছে। শনিবার নগর বিএনপি থেকে আরও এক হাজারের বেশি নেতাকর্মী পদত্যাগ করেছেন।

নগরের ৩নং ওয়ার্ড বিএনপি ও সকল সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে দুপুরে বহরমপুর ও দাসপুকুর সিটি বাইপাস সড়কে জরুরি সমাবেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা গণপদত্যাগ করেন। এর আগে গত ২৬ আগস্ট নগর যুবদল থেকে ৭০ নেতাকর্মী একযোগে পদত্যাগ করেন।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে বাদ দিয়ে নগর যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন ও নগর বিএনপির বেশ কয়েকটি পদে পরিবর্তনের পর থেকেই এ পদত্যাগ চলছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু ওই কমিটি গঠন করেছেন- এ অভিযোগ তুলে মিনুর ওপর ক্ষোভ থেকেই গণপদত্যাগ অব্যাহত রয়েছে।

শনিবার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলে ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি তাজউদ্দিন আহমেদ সেন্টু বলেন, দল এক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে চলছে। এতে দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। এক ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তের কারণে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হতাশ। সে কারণে এ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ সমাবেশ থেকে রাজশাহী নগরের ৩নং ওয়ার্ড বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, যুবদল ও জাসাস থেকে ১৫১ জন পদধারী নেতাকর্মী পদত্যাগ করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি তাজউদ্দিন আহমেদ সেন্টু, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান পিন্টু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি পলাশ ও সাধারণ সম্পাদক সেলিম ও রবিউল আওয়াল নয়ন, যুবদলের সভাপতি নাজির হাসান, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মিলুয়ারা মিনু, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমা বেগম। এছাড়াও ওই পাঁচটি কমিটির প্রতিটি ৫১ সদস্যবিশিষ্ট। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কমিটির সবাই পদত্যাগ করেন।

৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি তাজউদ্দিন আহমেদ সেন্টু বলেন, ৩নং ওয়ার্ড বিএনপি ও তার ৪ অঙ্গ সংগঠনের ১৫১ জন নেতাকর্মী সমাবেশে গণপদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন। এছাড়াও ৩নং ওয়ার্ড থেকে দলের এক হাজার জনের বেশি নেতাকর্মী মৌখিকভাবে পদত্যাগ করেছেন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনুর ওপর ক্ষোভ থেকেই গণপদত্যাগ চলছে। মহানগর বিএনপির ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক এবং ৩নং ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি তাজউদ্দীন আহমেদ সেন্টু বলেন, মিজানুর রহমান মিনু একক সিদ্ধান্তে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মহানগর বিএনপি, যুবদল ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠন করেছেন। মিনু তার তল্পিবাহক নিয়ে যুবমৈত্রী ও যুবলীগ থেকে সদ্য বিএনপির সদস্য হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে পকেট কমিটি বানিয়েছেন। মিনুর স্বৈরাচারী ভূমিকার প্রতিবাদ জানিয়ে তারা দল থেকে গণপদত্যাগ করেছেন।

দলের প্রবীণ সদস্য ও মহানগর বিএনপির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক আনসার জানান, তিনি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে রাজনীতি করছেন। দলের দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মিনু মূল্যায়ন করেননি। ঘরে বসে পকেট কমিটি বানিয়েছেন। মাঠে থাকেন না, অন্য দল থেকে আসা এমন ব্যক্তিদের দলের নেতা বানানো হয়েছে। এ ক্ষোভ থেকেই তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন।

রাজশাহী বিএনপির এমন দূরবস্থা এমন কোনো দিন হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বৈরাচারী মিনু যা করেছেন তা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। তিনি বিএনপির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর নেতা। মাঠে থেকে ফসল বুনবো আমরা, ফল খাবেন অন্যজন, তা হবে না।

৩নং ওয়ার্ড মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমা বেগম জানান, মিনু যেভাবে দল চালাচ্ছেন তাতে বিএনপিতে থাকা সম্ভব নয়। ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে তিনি নিজের মতো করে পকেট কমিটি বানিয়েছেন। মিনুর ওপর ক্ষোভ থেকেই তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন।

এদিকে রাজশাহী মহানগর কমিটি নিয়ে ইমেজ সংকটে পড়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু। যুবদলের ভেতরে রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলপন্থি হিসাবে পরিচিত নেতাদের বাদ দেওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মিনুর ওপর ক্ষোভ থেকে বিএনপি ও যুবদল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আরও শতাধিক নেতাকর্মী।

এর আগে গত ২৬ আগস্ট সোমবার রাতে নগরের সাফাওয়াং কমিউনিটি সেন্টারে একযোগে পদত্যাগ করেন ৭০ জন নেতাকর্মী। রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলসহ ওই পদত্যাগীরা বিএনপির কেন্দ্রীয় ও মহানগরের কোনো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছেন না।

বিএনপি সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে মহানগর যুবদলের কাউন্সিল হয়। ওই কাউন্সিলে দলের সভাপতি হন মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক হন আসলাম সরকার। দীর্ঘ নয় বছর পর সেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হন বুলবুলের সমর্থকরা। সে সময় রাতে মিনুর বাড়ি ঘেরাও করেছিলেন তারা। অবশেষে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে ২০১২ সালে আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়।

সে কমিটিতে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে আহবায়ক করা হয়। একই সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে ওয়ার্ড কমিটি করে মহানগরের কাউন্সিল করার নির্দেশ দেয় দলের হাইকমান্ড। কিন্তু আর কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়নি। নতুন যে কমিটি কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করেছে, তাতে বুলবুলপন্থিদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

মেয়র বুলবুল সমর্থকদের দাবি, মিজানুর রহমান মিনু নগরের রাজনীতিতে বুলবুলকে কোণঠাসা করতে এ কমিটি গঠন করেছেন। এতে তাবলিগে যোগ দেওয়া ওয়ালিউল হক রানাকে সভাপতি ও ছাত্রমৈত্রী থেকে দলে যোগ দেওয়া হিকোলকে সাধারণ সম্পাদক করেছেন।

তবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু জানান, মহানগর বিএনপিকে শক্তিশালী করতে নতুন এ কমিটি কেন্দ্র গঠন করেছে। দলের ত্যাগী নেতাদের বিএনপিতে পদ দেওয়া হয়েছে। বুলবুলকে ছোট ভাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি কাউকে কোণঠাসা করতে কমিটি করিনি।

ঢাকা, ৩০ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এএইচ