'ত্যাগী ও পরীক্ষিত' নেতাদের মূল্যায়ন না করে অন্য দল থেকে আসাদের পদ দেওয়ায় আক্রমনের মুখে পড়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ। সোমবার জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রতিনিধি সভায় একযোগে ক্ষোভ জানান নেতাকর্মীরা।

কাদেরও রাঙ্গাঁর সঙ্গে এই সভায় দলের সভাপতিমণ্ডরীর সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সালমা ইসলাম, নাজমা আক্তার ও ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম নূরুও উপস্থিত ছিলেন। রওশন এরশাদের অনুসারী নেতারা কেউ ছিলেন না।

৩৭ বছর ধরে জাতীয় পার্টি করে আসা দারুস সালাম থানার সভাপতি হামিদ হাসান সভায় বলেন, “আজকে দলে অনেক জুনিয়রদের আমাদের চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াতে হয়। আজকে চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের বাড়িতে অনেকে ঘুরঘুর করেন, যারা নেতাদের বাড়িতে ঘুরে বেড়ান, তাদের আসলে কিছু নাই। তারা তেল মেরে বেড়ান। অথচ তাদের প্রমোশন হয়। আমরা যারা তেল না মেরে রাজনীতি করি, তাদের কোনো প্রমোশন হয় না “

২৮ ডিসেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে ঢাকা মহানগর কমিটি গঠনের আগে নেতাদের সতর্ক হতে অনুরোধ করেন তিনি।

হামিদ বলেন, “নেতাকর্মীদের আমলনামা দেখে তবেই মূল্যায়ন করুন।”

সভায় অংশগ্রহণকারী ক্ষোভ জানাতে থাকেন জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এস এম ফয়সল চিশতি ও শফিকুল ইসলাম সেন্টুর বিরুদ্ধে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পর দলে দ্বন্দ্ব যখন চরম পর্যায়ে, তখন কাদেরকে ছেড়ে ফয়সল চিশতি ভিড়েছিলেন রওশন শিবিরে। সমঝোতার পর কাদের চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকলে চিশতি আবার বনানী কার্যালয়ে ফেরেন।

চিশতির এই ‘দলবদল নাটক’ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে।

মোহাম্মদপুর থানার সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বলেন, “আজকে ঢাকা উত্তরকে নিয়ে অনেক নাটক হচ্ছে। আজকে একটি থানা কমিটি চালানোর অ্যাবিলিটি নাই, জনসভায় ৫০টা লোক আনতে পারে না, সে লোক কি না উত্তরের সভাপতি হন!”

ফয়সল চিশতিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “দালালি ছাড়েন, দালালি ছেড়ে নেতা হন।”

জাতীয় পার্টি মহানগর উত্তরের প্রতিনিধি সভায় উপস্থিত থাকার কথা ছিল সাধারণ সম্পাদক সেন্টুর। ব্যানারেও ছিল তার নাম। কিন্তু তিনি আসেননি।

চিশতি সভায় জানান, সেন্টু হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন।

চলমান ক্যাসিনো অভিযানের শুরুর দিকে কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের ক্লাব কাহিনিতে উঠে আসে সেন্টুর নাম। তবে সেখানে অভিযান চালানোর ঠিক আগে গা ঢাকা দেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর সেন্টু।

ক্যাসিনো বন্ধের অভিযানকে জাতীয় পার্টি স্বাগত জানালেও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সেন্টুর বিরুদ্ধে এখনও সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে।

মিরপুর থানার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম পাঠান বলেন, “সুবিধাভোগী নেতাদের উপরের কাতারে ঠাঁই দেওয়া হয়। পোড় খাওয়া নেতাদের মূল্যায়ন হয় না।”

বিমানবন্দর থানার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম নয়ন বলেন, “অনেক উটকো লোক দলে ঢুকে পড়েছে। তারা গণ্ডগোল করছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার আগে সতর্ক থাকতে হবে। অযোগ্য লোককে দলে ঢুকালে দল দুর্বল হয়ে পড়বে।"

রামপুরা থানার সভাপতি আবুল খায়ের, পল্লবী থানার সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম চুন্নু, বাড্ডা থানার সভাপতি মহিউদ্দিন ফরাজী, উত্তরা পূর্ব থানার সাধারণ সম্পাদক আখতারুজ্জামান মাসুমসহ আরও অনেকেও সভায় উত্তরের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ জানান।

তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, “আমাদের দলে কিছু ক্ল্যাসিকাল ধূর্ত আছে। তারা নানা কানকথা ছড়িয়ে ও ষড়যন্ত্র করে দলকে নষ্ট করে দিতে চান।”

সবার ক্ষোভ শুনে চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, “নেতাদের প্রমোশনের কিছু ক্ষেত্রে ভুল ছিল আমাদের। নেতারা কে কত দিন ধরে দলে আছেন, তাদের কার্যক্রমের কোনো সঠিক রেকর্ড নাই। আমরা কাজ করছি। কথা দিচ্ছি, সব ক্ষোভ ও অভিযোগের জবাব আমরা দিতে পারব।”

যারা দলে পদ বা পদোন্নতি চান, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “নাম বা পদবি দিলেই কি নেতা হওয়া যাবে? সে নেতার নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ক্ষমতা থাকতে হবে। মানুষ এখন সামাজিক নিরাপত্তা খোঁজে। যে নেতারা তাদের বিপদের দিনে তাদের পাশে দাঁড়াবে, তারাই প্রকৃত নেতা।”

নিজের সমালোচনার জবাবে এরশাদের ভাই কাদের বলেন, “আমি কখনও লোভ, লালসা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিই না।”

‘দেখিয়ে দেব আন্দোলন কাকে বলে’

সভায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির সখ্য নেতা-কর্মীরা ক্ষোভ জানালে তা প্রশমনে মহাসচিব রাঙ্গাঁ সরকারের বিরুদ্ধে নামার ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেও তৃণমূলে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের উপর তাদের নেতা-কর্মীরা ‘জুলুম-নির্যাতন’ করছেন।

রাঙ্গাঁ বলেন, “জুলুম-নির্যাতন করার জন্য আমরা তাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসি নাই। নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ আমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে নাই। আমরা পার্লামেন্টে গিয়ে এর জবাব চাইব।”

তৃণমূলে জাতীয় পার্টির কোনো নেতাকর্মী আওয়ামী লীগের কারও নিগ্রহের শিকার হলে তা সঙ্গে সঙ্গে তাকে জানাতে অনুরোধ করেন রাঙ্গাঁ।

তিনি বলেন, “আজকে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের গ্রাস রুটের কর্মীরা আমাদের হুমকি দেয়। আমরা আওয়ামী লীগকে বলব, আপনাদের নেতাকর্মীদের সোজা করেন। নইলে আমরা জানি কিভাবে সোজা করতে হয়।”

“সময় আসুক। জবাব কাকে বলে, আন্দোলন কাকে বলে আওয়ামী লীগকে আমরা দেখিয়ে দেব,” হুমকি দেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারের প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গাঁ।

এএইচ