বাংলাদেশ সরকারের চাপের মুখে তাকে দিল্লীতে ঢুকতে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন এক সিনিয়র বৃটিশ আইনজীবী।
জেলে বন্দী বাংলাদেশের এক বিরোধী নেতার পক্ষে যাতে তিনি লবিং (Lobbying) করতে না পারেন সেজন্যই ভারতের রাজধানীতে তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি বলেও দাবি ওই আইনজীবীর।
বৃটিশ আইনজীবী লর্ড এলেক্স কার্লাইল কিউসি (Lord Alex Carlile QC) বলেন, তিনি ভারতের এমন আচরণে মর্মাহত (Shocked)। তিনি মনে করেন, ভারতের উচিত ছিল বাংলাদেশ সরকারের সাথে বিষয়টি সুন্দরভাবে নিস্পত্তি করা।
উল্লেখ্য, জেলে আটক বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী টিমের সদস্য হিসেবে কার্লাইল কাজ করছেন।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াত স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের নামে গঠিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ ৫জনকে আসামী সাব্যস্ত করে ৫ বছরের কারাদন্ড প্রদান করা হয়।
এই মামলায় নিযুক্ত খালেদার বিদেশী আইনজীবী কার্লাইলকে গত বৃহস্পতিবার (১২ জুলাই) সকালে নিউ দিল্লী বিমানবন্দর থেকেই বৃটেনে ফেরত পাঠানো হয়। তাকে বিমানবন্দরের বাইরে বের হতে দেয়নি দেশটির ইমিগ্রেশন পুলিশ।
খালেদার আইনজীবী বলেন, বাংলাদেশ বহিরাগত রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত এক দেশে (A pariah state) পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধি দল ভারত সফরের পর পরই দেশটিতে তাকে এভাবে প্রবেশ করতে না দেয়ার ঘটনায় ভারতের মাথা লজ্জায় নত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন কার্লাইল।

এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ড. আদর্শ সোয়াইকাকে (Dr Adarsh Swaika) মন্ত্রনালয়ে তলব করে এবং আইনজীবী লর্ড কার্লাইলের আসন্ন ভারত সফরের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
কার্লাইলের ভিসা বাতিলের ব্যাপারেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে অনুরোধ জানানো হয় বলেও খবরে বলা হয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার (Al Jazeera) পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হকের (Shahidul Haque) সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি এ সংক্রান্ত প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি। পরে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশন অফিসে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।
সন্দেহজনক তৎপরতা
এদিকে, বৃটিশ আইনজীবীকে দিল্লী থেকে ফেরত পাঠানোর পরপরই ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র রাভিশ কুমার (Raveesh Kumar) ভারতীয় ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে তলবের বিষয়ে কিছু উল্লেখ না করে এক বিবৃতিতে শুধু বলেন, কার্লাইল গত ১১ জুলাই নয়া দিল্লীতে আসেন যথাযথ প্রক্রিয়ায় ভিসা সম্পন্ন না করেই।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, দিল্লীতে তার সম্ভাব্য তৎপরতার সাথে ভিসা আবেদনে ভারত সফরের যে বিবরণ দেয়া হয়েছে তার মধ্যে অসামাঞ্জস্যতা (Incompatible) পরিলক্ষিত হয়েছিল।
বৃটিশ ওই আইনজীবীর সফরের মধ্য দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টির প্রয়াস বিদ্যমান ছিল বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
পরে বৃহস্পতিবার (১২ জুলাই) এক সাংবাদিক সম্মেলনে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ওই মুখপাত্র বৃটিশ আইনজীবীর দিল্লী সফরকে সংশয়যুক্ত (A bit suspect) বলে আখ্যায়িত করেন।
মুখপাত্র কুমার বলেন, বৃটিশ আইনজীবীর সফরে মনে হচ্ছিল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কে তিক্ততা এবং একই সাথে ভারত ও বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যেও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে ওই সফর।
কার্লাইলের পাল্টা যুক্তি
লর্ড কার্লাইল আল জাজিরাকে বলেন, তিনি ভারতের নিকট “ই-ভিসা ফর বিজনেস (e-visa for business)”- এর জন্য আবেদন করেছিলেন এবং আবেদনপত্রে উল্লেখিত সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়েছিলেন।
তিনি ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্রের দেয়া বক্তব্যকে সম্পূর্ণরুপে ভুল ও ন্যায়ভ্রষ্ট (completely inaccurate and unjustified) বলে আখ্যায়িত করেন।
এজন্য ভারতীয় হাইকমিশনারের বরাবর ব্যাখ্যা চেয়ে এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করে লিখিত আবেদন করবেন বলেও জানান কার্লাইল।
বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক নেতার মামলার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে অবহিত করতেই তিনি ভারত সফর করতে চেয়েছিলেন- এমন দাবি করে কার্লাইল বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে আগ্রহী বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যম দিল্লীতে কাজ করছে। তাই এই স্থানকেই এ ধরনের বিষয় অবহিত করার জন্য তার কাছে যথাযথ বলে মনে হয়েছিল।
“জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিষয়ে আমার মূল সমস্যা হলো এটা একেবারেই একটি রাজনৈতিক মামলা এবং এর কোনো প্রমান নেই।”
কার্লাইল আরো বলেন, তাকে (খালেদা জিয়াকে) সম্পূর্ণভাবে আইনের শাসন উপেক্ষা করে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং এই মামলায় মারাত্মকভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ (political interference) লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ক্ষুব্ধ বৃটিশ আইনজীবী বলেন, “The independence of judiciary does not exist in Bangladesh any more.” অর্থাৎ- “বাংলাদেশে কোনো ধরনের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অস্তিত্ব আর নেই।”
তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী আইনজীবীদের অফিসে বার বার হানা (Raid) দেয়া হচ্ছে, শুনানিকে প্রভাবিত (Manipulated) করা হচ্ছে।
মামলা সঠিক
তবে, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা (Bangladesh attorney general) মাহবুবে আলম (Mahbubey Alam) কার্লাইলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধের মামলাটি রাজনৈতিক নয়। কারণ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট থেকে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং তিনি এজন্য দায়ী। এটা একটি সঠিক মামলা যা উপযুক্ত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে।
তিনি বৃটিশ আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এই মামলায় খালেদা জিয়াকে উচ্চ আদালত জামিন দিয়েছে, এমতাবস্থায় তিনি কি করে বলেন যে আদালত স্বাধীন নয়?
চলতি বছরের মে মাসে এতিমের অর্থ আত্মসাতের এই বিতর্কিত মামলায় খালেদা জিয়াকে জামিন দেয় উচ্চ আদালত। কিন্তু অপর তিনটি মামলা বিচারাধীন থাকায় তাকে কারাগার থেকে বের করা যায়নি।
আসছে নির্বাচনে মামলার প্রভাব
খালেদার বৃটিশ আইনজীবী কার্লাইল পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, তিনি সাংবাদিকদের অবহিত করতে চেয়েছিলেন যে চলতি বছর শেষেই বাংলাদেশে যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেখানে দেশটির বর্তমান সরকার খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করতে চায়।
লন্ডন-ভিত্তিক এই আইনজীবী বলেন, তাকে দিল্লী থেকে যেভাবে ফেরত পাঠানো হলো তা বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশ্যকে আরো ব্যহতই (Backfired) করলো কারণ এখন এই মামলার দিকে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আরো তীক্ষ্ণ হলো।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রধান ইসলামিক দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিএনপির জোটের কারণেই ভারতের সাথে দলটির কিছুটা টানাপোড়েন চলছে বলে মনে করা হয়।
অবশ্য এরইমধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতকে নির্বাচনে অংশগ্রহনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
তবে, মাঠ পর্যায়ে দলটির বিপুল সংখ্যক ভোটার ও দক্ষ কর্মী বাহিনী থাকার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিন দিন জামায়াতের প্রভাব বেড়েই চলছে এবং ভেতরে ভেতরে সরকার ও বিরোধী উভয় দলই জামায়াতকে নিজেদের জোটে সম্পৃক্ত করতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিগত ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে বলেও ভারতের অভিযোগ রয়েছে।
তবে, আসন্ন নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক তৈরির চেষ্টা ততই বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমদ বলেন, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভারত একটি বড় ভূমিকা পালন করবে বলেই সবার ধারনা।
তিনি মনে করেন, বিএনপিও এখন ভারতকে আশ্বস্ত করতে চাইবে যে অতীতের তিক্ত সম্পর্ককে পেছনে ফেলে তারাও ভারতের বিশ্বস্ত ও ভালো সঙ্গী (Partner) হতে পারে।
(বি. দ্র. বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের লেখা আল জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে, আল জাজিরার শিরোনাম: UK lawyer alleges India deported him under Bangladesh pressure, আল জাজিরার মূল প্রতিবেদন পড়তে এখানে ক্লিক করুন: https://www.aljazeera.com/news/2018/07/uk-lawyer-alleges-india-deported-bangladesh-pressure-180713094355772.html)
কেবি/এমবি





