জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।

চারদিকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কারারক্ষী, পুলিশ ছাড়াও রয়েছেন গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা। কথায় বলে- ‘সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না’। হ্যাঁ তাই দেখতে দেখতে সময় প্রায় এক বছরে গড়ালো।

আজ ৩৩৫ দিন কারাগারে বন্দী বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পুরনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নির্জন অবস্থায় বন্দী রয়েছেন তিনি।

বিদায়ী ২০১৮ সালে রাজনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলের আলোচনায় ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবরণের ঘটনা। বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ছিল যে শেষ পর্যন্ত জামিনে মুক্ত হবেন তিনি। কিন্তু তাদের সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।

বেগম খালেদা জিয়ার বন্দিদশার এই সময়ে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত বছর ৭ অক্টোবর তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করা হয়। এরপর সেখানে একাধিকবার তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। তার বিরুদ্ধে ৩৫টি মামলা। এসব মামলার বেশির ভাগেই তিনি জামিন পান। তবে কুমিল্লায় দায়েরকৃত নাশকতার একটি মামলায় জামিন পাননি তিনি।

বিচারাধীন এই মামলার চার্জ গঠন ও পরবর্তী শুনানি ১৬ জানুয়ারি ধার্য করেন আদালত। এ দিকে প্রায় তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলেও বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তার নিকটাত্মীয়দের দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই অভিযোগ করে বলেন, বন্দীদের জন্য যে আইনসম্মত অধিকার তা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে বেগম জিয়াকে। এই নিষ্ঠুর আচরণ কিসের ইঙ্গিতবাহী? ৭ সদস্যের প্রতিনিধিদল দেখা করার অনুমতি চেয়ে সর্বশেষ গত বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেছে বিএনপি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খালেদা জিয়া কবে নাগাদ মুক্তি পেতে পারেন তা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছেন না আইনজীবীরা। তবে আইনজীবী ও বিএনপি নেতাদের মতে, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি সরকারের ওপরই নির্ভর করছে। সরকারের শীর্ষ মহলের বাধায় তিনি জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন না। বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের অন্যতম বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল গতকাল সোমবার নয়া দিগন্তকে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির পথে একমাত্র বাধা হচ্ছে রাষ্ট্র।

আদালত জামিন দেয়ার পরও অবৈধভাবে তাকে আটক রাখা হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আসলে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন কায়সার কামাল।

নির্জন কারাগারে ৭৪ বছর বয়সী খালেদা জিয়া একাধিবার অসুস্থ হন বলে তার পরিবার ও দলের অভিযোগ। বেগম জিয়া গত বছরের ৫ জুন কারাগারে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। তাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়ার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল বা ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করাতে সরকারের কাছে দাবিও জানায় দলটি। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে একাধিকবার দেখাও করেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। কিন্তু তাদের দাবিকে সরকার গুরুত্ব দেয়নি।

দেখা করার অনুমতি মিলছে না : গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলেও বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তার নিকটাত্মীয়দের দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না। বন্দীদের যে আইনসম্মত অধিকার তা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে বেগম জিয়াকে।

বিশাল লাল দেয়ালের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়াকে অন্তরীণ রেখে বাইরের দুনিয়া থেকেও সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করার পাঁয়তারা চলছে। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে দেয়ার যে কারাবিধান সেটিকে গায়ের জোরে লঙ্ঘন করাটা বেগম জিয়াকে নিয়ে সরকারের নতুন কোনো খারাপ পরিকল্পনা কি না তা নিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন আরো দীর্ঘতর হচ্ছে।

তিনি জানান, পৃথিবীর কোনো নিষ্ঠুর স্বৈরতান্ত্রিক দেশেও বন্দীদের সাথে এরূপ দুর্ব্যবহার করা হয় না, যা করা হচ্ছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে। তার একান্ত সচিব, আত্মীয়স্বজন ও দলের সিনিয়র নেতারা সাক্ষাতের জন্য বারবার আবেদন করার পরও কারাকর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করেনি। কারাবিধি অনুযায়ী ৭ দিন পরপর বন্দীদের সাথে সাক্ষাতের নিয়ম।

অথচ বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এই বিধান করা হলো ১৫ দিন পরপর। এখন সেই ১৫ দিনের বিধানকেও সরকারের নির্দেশে কারা কর্তৃপক্ষ অগ্রাহ্য করছে। বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তার নিকটাত্মীয়দের দেখা করতে না দেয়াটা কঠিন মানসিক নির্যাতন। এ নিয়ে দেশবাসী উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত। অবিলম্বে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তার আত্মীয়স্বজনদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো: আখতারুজ্জামান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেন। ওই দিনই তাকে আদালতের পাশে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিত্যক্ত ওই কারাগারে একমাত্র বন্দী তিনি।

এএস