সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি।

একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এলে সরকারের পছন্দের বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় জাতীয় পার্টি। এমনকি ক্ষমতার অংশীদারিত্ব হিসেবে কয়েকজন নেতাকে মন্ত্রীত্বও দেয়া হয়।

পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদকে করা হয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।

৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের মর্যাদা পেলেও দলের সাংগঠনিক অবস্থা পরিণত হয় অনেকটাই লেজেগোবরে। সর্বশেষ তিন সিটিতে জাপা(এরশাদ) সমর্থিত ভোটের চিত্রই তা পরিষ্কার হয়ে উঠে।

ঢাকা দক্ষিণের প্রার্থী হাজি সাইফুদ্দিন আমম্মেদ মিলন, উত্তরে বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল ও চট্টগ্রামে সোলায়মান শেঠসহ তিন প্রার্থী মোট ১৩ হাজার ৬শ’ ভোট পেয়েছেন। মেয়র পদে তিন সিটিতেই জাপা প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। শুধু তাই নয় এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন রেকর্ড। এ যাবত কোনো স্থানীয় নির্বাচনে সংসদের বিরোধী দল একসঙ্গে জামানত হারানোর রেকর্ড এর আগে দেখা যায় নি।

৩ সিটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থীদের এই বিপর্যয়ের পর বেশ সমস্যায় পড়েছেন দলটির প্রভাবশালী নেতা ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা।

ভোটের মাঠে এই ভরাডুবির জন্য সংশ্লিষ্টদের দায়ী করে তাদের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর দলের প্রার্থীরা সন্তোষজনক ভোট না পাওয়ায় মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়েছেন তিনি। কারণ নির্বাচনের আগেও কয়েকটি অনুষ্ঠানে এরশাদ দাবী করেছিলেন বিএনপি নি:শেষ হয়ে গেছে। সেজন্য দেশে জাতীয়তাবাদের রাজনীতি একমাত্র জাপাকে দিয়েই সম্ভব। কিন্তু তিন সিটির ফলাফল পাল্টে দিয়েছে সবকিছু।

অবস্থা এমন হয়েছে যে, এ নিয়ে প্রকাশ্যে এরশাদ কিছু বলতেও পারছেন না। কারণ ফলাফল মেনেও নিতে পারছেন না আবার সরকারের বিরুদ্ধে কারচূপির অভিযোগও আনতে পারছেন না।

দলটির একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, এরশাদ চেষ্টা করছিলেন নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ থাকবে। কিন্তু তা হয়নি। বরং উল্টো হয়েছে। এতে আগামীতে রাজনীতির মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ২০ দলের নেতারা জাতীয় পার্টিকে সেই রকম মূল্যায়ন করবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, দলের চেয়ারম্যান মনে করেন নির্বাচনে পার্টির নেয়া পলিসি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। সেজন্য দলের এই বিপর্যয় হয়েছে।

ঢাকা মহানগর জাপার দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, নির্বাচনে প্রার্থীদের বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করতে শিগগিরই বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, দলের প্রেসিডিয়াম পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন এরশাদ। সেই বৈঠকে এর কৈফিয়ত তলব করতে পারেন পার্টির চেয়ারম্যান।

অপরদিকে দলের এ বিপর্যয়ের জন্য তৃণমূল নেতা ও পার্টির সমর্থিত মেয়র এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীসহ নির্বাচনে অংশ নেয়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর নেতাকর্মীরা পাল্টা ক্ষেপেছেন দলের চেয়ারম্যান ও পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুর ওপর।

জাতীয় পার্টির নির্বাচন নিয়ে দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে রহস্যজনক ভূমিকার অভিযোগ তুলেছেন তারা। তারা বলেন, সরকারি দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা জবরদখল করে নজিরবিহীন ভোট কারচুপি করলেও পার্টির চেয়ারম্যান-মহাসচিবের কারণে নির্বাচন বর্জন করতে পারেননি তারা।

সমঝোতার নামে তাদের শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। এমনকি নির্বাচনে থাকলে বেশ কয়েক কাউন্সিলর প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েও রক্ষা করা হয়নি।

দলের অন্য একটি সূত্র বলেছে, নির্বাচনের পরদিন থেকেই প্রার্থীদের অনেকেই দল ছাড়ার হুমকিও দিয়েছেন। কেউ কেউ মহাসচিবের বাসায় গিয়ে তাকে অভিযুক্ত করে ক্ষুব্ধ মনোভাবও ব্যক্ত করেছেন। তাদের অনেকেই আর জীবনে জাতীয় পার্টি করবেন না বলেও জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে প্রকাশে অপারগতা জানিয়ে এক মেয়র প্রার্থী বলেন, কী বলব, এর নাম যদি হয় রাজনীতি? সিনিয়র নেতারা সমঝোতার নামে দালালি করে আমাদের টাকা-পয়সা নষ্ট করেছে।

তিনি আরও বলেন, সকাল থেকে যখন সরকারি দলের নেতাকর্মীরা কেন্দ্র দখল করে ফেলল, তখনই আমরা নির্বাচন বর্জন করতে চাইলাম। কিন্তু পার্টির চেয়ারম্যান দলের মহাসচিবের পরামর্শে তা করতে দিলেন না।

ওই প্রার্থী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আরো বলেন, গর্জন ছাড়া জাতীয় পার্টির আর কিছুই নেই। এই পার্টি করে কী লাভ? এ দল থেকে জীবনে আর কোনো দিন নির্বাচনই করব না।

এমএইচ/এসএইচ