বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমানার রায়ে ঐতিহাসিক দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়েছে। এই তালপট্টি দ্বীপটি যেন বেহাত না হয় তার জন্য সোচ্চার ছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। যুদ্ধ জাহাজের উপস্থিতিও ছিলো এই দ্বীপকে কেন্দ্র করে।
বিগত সময়ে বিএনপি সরকারও দাবি জানিয়েছে এই দ্বীপটি নিয়ে। কিন্তু তোষামোদের রাজনীতিতে মত্ত এখনকার বিএনপি তালপট্টি নিয়ে দায়সারাভাব দেখাচ্ছে। দেশ গেলো, বিক্রি হলো স্লোগান দিয়ে যে দলটি রাজপথে ঝড় তোলে এবার দেশের মানচিত্র বদলে গেলো অথচ তারা নীরবতা পালন করছেন।
গতকাল সমুদ্র সীমানার রায় নিয়ে যে সংবাদ সম্মেলন করেছে তাতে আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ, পানি বিশেষজ্ঞ বা কোন বিশ্লেষকও ছিল না। ভারতপন্থী বিএনপি নেতা হিসেবে খ্যাত এক আমলা নেতাসহ তিনজনের উপস্থিতিতে দলীয় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দায় সেরেছেন তারা। এ নিয়ে বোদ্ধামহলে চরম সমালোচনা শুরু হয়েছে। তারা বলছেন, ভারত তোষামোদের কাছে আমাদের দ্রেশপ্রেম ও রাজনীতি আজ হার মেনেছে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের একজন ড. কামাল হোসেন বলেন, তালপট্টি আমাদের জাতীয় সম্পদ। ভারত এই সীমানার দাবি করে আসছিলো; কিন্তু গত ৪০ বছর আমরা তা মেনে নেইনি। আজ জাতীয় সম্পদ নিয়ে জাতীয়ভাবে সোচ্চার হওয়ার কথা ছিলো। কারণ এটি আমাদের কাছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আমানত। দেশের স্বার্থ দেখার দরকার ছিলো।
গত ৮ জুলাই ভারতের সঙ্গে নতুন সমুদ্রসীমা নির্ধারনে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায় প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী। রায় অনুষায়ী বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ সাড়ে ২৫ হাজার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার কিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশ পেয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে এই রায়ের কথা প্রকাশ করে বলেন, এই রায় উভয় রাষ্ট্রের জন্য বিজয় নিশ্চিত করেছে। এ বিজয় বন্ধুত্বের বিজয়। এ বিজয় বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের বিজয়।
ওই দিনই বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ ব্যক্তিগতভাবে যে প্রক্রিয়া দিয়েছিলেন তাতে প্রতিবাদ ছিলো। কিন্তু গতকালের বক্তব্যে নমনীয়তার বহি:প্রকাশ ঘটেছে। গতকালের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, সাকেব তিন আমলা শমসের মবিন চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, ইনাম আহম্মেদ চৌধুরী।
তালপট্টির জন্য জিয়া: আওয়ামী লীগ সরকার বলছে, তালপট্টি দ্বীপের কোনো অস্তিত্ব নেই। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৫ সালে এ সংক্রান্ত মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছিলো। রিয়ার এডমিরাল খুরশেদ সাহেব ওই সময়ে নৌবাহিনীতে কাজ করতেন। তিনি নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে তালপট্টিতে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেখানে একটি লাইট হাউজও স্থাপন করা হয়েছিলো। এখন তিনি ভিন্ন কথা বলেছেন।
১৯৭৫ সালের পরে জিয়াউর রহমান সার্ভে শুরু করলে ভারতীয় নৌবাহিনী কানাডিয়ান সার্ভে জাহাজকে তাড়া করে। পরে প্রেসিডেন্ট জিয়া দক্ষিণ তালপট্টির দিকে বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই’র সাথে জিয়াউর রহমানের এ ব্যাপারে আলোচনা হয়। তখন বাংলাদেশ সরকার তালপট্টির ব্যাপারে একটি যৌথ সমীক্ষার প্রস্তাব দেয়। তবে তালপট্টির মালিকানা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রথম বিরোধ দেখা দেয় ১৯৮০ সালে। পরে ১৯৮০ সালে এক যৌথ বিবৃতি দেয় দু’দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, The question of the newly emerged island(s) (New Moore/South Talpatty/Purbasha) at the estuary of the border river Hariabhanga was also discussed. The two sides agreed that after study of the additional information exchanged between the two governments, further discussion would take place with a view to settling it peacefully at an early date..’
কিন্তু সেই বিবৃতি ভুলে ১৯৮০ সালের ২০ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের রাজ্য সভায় ঘোষণা করেন, দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ ভারতের। এর জবাবে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামসুল হক ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বলেন, দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ বাংলাদেশের। এরপর ১৯৮১ সালের ৯ মে ভারত দক্ষিণ তালপট্টিতে আইএনএস সন্ধ্যায়ক নামে নৌ-বাহিনীর এক জাহাজ পাঠিয়ে ভারতের পতাকা উত্তোলন করে। বাংলাদেশ এর তীব্র প্রতিবাদ করে। তার কিছু পরে ভারত সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে। তবে পরবর্তী সময়ে দু’দেশের শীর্ষ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় জাতিসংঘের ল’ অব দ্যা সি অনুযায়ী’ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা মীমাংসিত হবে। এরপর ২৩ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিএনপি’র জাতীয় কমিটির বর্ধিত সভায় বলেছিলেন, দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের সমস্যা সমাধানে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এরপর ৩০ মে তিনি চট্টগ্রামে মর্মান্তিকভাবে শাহদাত বরণ করেন।
খালেদা জিয়াও সোচ্চার ছিলেন: বিএনপি শাসনামলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলাদা মেরিটাইম সেল, দক্ষ জনবল নিয়োগ, একটি আলাদা ভবনসহ বিশেষজ্ঞদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলো। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশেই মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছিলো। যাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা, নৌবাহিনী, জরিপ অধিদপ্তর, স্পার্সোসহ ৭টি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিলো। ওই সময়ে সমুদ্রের বিষয়ে কোনো প্রকৃত তথ্য ছিলো না। কেবল তাই নয়, সেময় সমুদ্রে জাহাজ নিয়ে জরিপও চালানো হয়েছিলো।
সোচ্চারের পর নমনীয় প্রসঙ্গে বিএনপির এক নেতা বলেন, তালপট্টি আমাদের জাতীয় সম্পদ। ভারত এই সীমানার দাবি করে আসছিলো; কিন্তু গত ৪০ বছর আমরা তা মেনে নেইনি। আজ জাতীয় সম্পদ নিয়ে জাতীয়ভাবে সোচ্চার হওয়ার কথা ছিলো। কারণ এটি আমাদের কাছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আমানত। দেশের স্বার্থ দেখার দরকার ছিলো।
এই সংক্রান্ত বিষয়ে বিজ্ঞ এক আইনজীবীর ভাষায় বলা যায়- 'তোষামোদের রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন চলছে'। সূত্র: ইনকিলাব।
ঢাকা, ১১ জুলাই(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস





